অনুবাদের ভূমিকা
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হয়ে গেছে প্রায়। এর মধ্যেই অনেকে ব্যর্থতার উপলব্ধির কথা বলছেন। অনেকেই আবার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব করে ফেলেছেন। ইতোমধ্যে অভ্যুত্থান ঘটতে দেখেছি আমরা নেপাল, মাদাগাস্কার, ইন্দোনেশিয়া, তিমুর, মালদ্বীপসহ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেকগুলো দেশেই। চরিত্রগত দিক থেকে এই আন্দোলনগুলোর একটা সাদৃশ্য আছে। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের রাস্তায় বিক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব, সুস্পষ্ট নেতৃত্বহীন বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলন প্রভৃতি দিক বিবেচনা করলে এগুলোর একটা তুলনামূলক বিশ্লেষণ জরুরি বলেই মনে হয় । শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের আগেই। এর আগে শ্রীলংকায় অভ্যুত্থান ঘটতে দেখেছি আমরা, তারও আগে দেখেছি লাতিন আমেরিকায়, আরব বসন্তে। এই অভ্যুত্থানের অনেকগুলোই সরকার পতনে সফল হয়েছে, অনেকগুলো হয়েছে ব্যর্থ। কিন্তু চরিত্রগত দিক বিচার করলে এই অভ্যুত্থানগুলোর মধ্যে ছিল বিপ্লবী সম্ভাবনা, তবে ঠিক পূর্ণাঙ্গ অর্থে কোনো বিপ্লব হয়ে উঠতে পারেনি এই আন্দোলনগুলো। একুশ শতকের নতুন এক বৈশ্বিক প্রপঞ্চ হিসেবে হাজির হয়েছে এই ব্যর্থ বিপ্লবগুলো। একুশ শতকের এই বিপ্লবী অভ্যুত্থানগুলোকে বুঝতে যে কয়জন গবেষকের কাজ আমাদের সহায়ক হয়ে উঠে, তার মধ্যে আসেফ বায়াতের নাম করতেই হয়। ইরানি এই সমাজতাত্ত্বিক কাজ করেছেন আরব বসন্ত নিয়ে। দেখিয়েছেন কীভাবে একুশ শতকের বিপ্লবগুলো বিশ শতকের থেকে আলাদা, কেন এগুলো বিপ্লবী রূপান্তরে ব্যর্থ হচ্ছে। এগুলোর সম্ভাবনাও তিনি খতিয়ে দেখতে চেয়েছেন। সে উদ্দেশ্যেই বায়াত প্রতিষ্ঠা করেছেন কতগুলো তাত্ত্বিক কাঠামোর।
বায়াতের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের একটা প্রধান অছিলা হলো আরব বসন্ত ও সত্তরের দশকের ইরান বিপ্লব। আরব বসন্তের ঘটনাপরম্পরা ও বিপ্লবোত্তর সমাজ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই বায়াত চেষ্টা করেছেন একুশ শতকের সামাজিক পরিবর্তন, গণআন্দোলন ও বিপ্লবের ধারণাকে নতুনভাবে বুঝতে। সামাজিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তিনি আমাদের সামনে নীরব অনুপ্রবেশ (quiet encroachment), অ-আন্দোলন (non-movement), সংস্কার-বিপ্লব (refolution)-এর মতো বেশ কিছু নতুন ধারণা হাজির করেছেন। বায়াত দেখিয়েছেন, রাজনীতি কেবল রাষ্ট্র, দল বা সংগঠিত আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজে প্রাত্যহিক জীবনের ভেতরেই জীবন্ত থাকে নানাভাবে। বিপ্লব, অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক আন্দোলন বিশ্লেষণে বায়াতের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান এখানেই। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও কর্মকাণ্ডকে তিনি নিয়ে আসেন রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে। তার মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন যে সবসময় সংগঠিত আন্দোলন, বিপ্লবী মতাদর্শ বা সুসংগঠিত নেতৃত্বের মধ্যদিয়েই ঘটবে তাই না। বরং অনেক সময় সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—যেমন শহুরে দরিদ্রশ্রেণি, অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত শ্রমিক, অভিবাসী বা বেকার যুবসমাজ নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদেই এমন সব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয় যা ধীরে ধীরে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে তৈরি করে এক নীরব সংঘাত। এই নীরব সংঘাত প্রায়শই প্রকাশ্য রাজনৈতিক আন্দোলনের ভাষা পায় না, কিন্তু সেগুলো সামাজিক বাস্তবতার গভীরে গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে। Street Politics: Poor People’s Movements in Iran (1997) বইয়ে এ নিয়ে বিস্তর আলাপ করেছেন বায়াত। ইরানের শহরাঞ্চলের নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংগ্রাম বিশ্লেষণ করে বায়াত দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র ও বাজার-কাঠামো যখন মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ নিজেরাই শহরের সম্পদ ও অবকাঠামোগুলোর উপর নিজেদের অনানুষ্ঠানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। যেহেতু অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলোতে থাকে না রাষ্ট্রের সর্বোত নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি, এগুলোই হয়ে উঠে নীরব অনুপ্রবেশের ক্ষেত্র। সরকারি জমি দখল করে বসতি স্থাপন অথবা ফুটপাথ ও রাস্তার ধারে দোকান খুলে ব্যবসা করতে বসে যাওয়া, অবৈধ বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ ব্যবহার করে মৌলিক সেবাগুলোর অধিকার আদায় করে নেয়া, এ সমস্ত কিছুকেই বায়াত বলছেন, “Non-movement” বা “quiet encroachment of the ordinary” অর্থাৎ সাধারণ মানুষের নীরব অনুপ্রবেশ। এগুলো কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগের ধীর কিন্তু ধারাবাহিক বিস্তার। কিন্তু যখন এই নীরব অনুপ্রবেশে যুক্ত হয় বিপুল সংখ্যক মানুষ তখন এই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোই হয়ে উঠে নগরজীবনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। Life as Politics: How Ordinary People Change the Middle East (2010) বইয়ে বায়াত তার এই বিশ্লেষণকে আরও দূর বিস্তৃত করেন। বায়াত দেখাচ্ছেন কীভাবে আমাদের সমাজে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন ঘটে এমন সব মানুষের সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আন্দোলন কিংবা কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক প্রকল্পেরও অংশ নয়। সরাসরি কোনো পারস্পরিক সমন্বয় তাদের মধ্যে থাকে না, কিন্তু একই বাস্তবতা, জীবনসংগ্রাম, আকাঙ্ক্ষা, ও সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে চলতে গিয়ে তাদের মধ্যে একটা সমন্বিত সামাজিক চর্চা গড়ে উঠে। এই চর্চাগুলো একত্রে একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করে, যেই প্রতিরোধ কালক্রমে পাল্টে দিতে পারে বিদ্যমান সামাজিক নিয়ম, নৈতিকতা ও ক্ষমতাকাঠামোকে। যার থেকে জন্ম নিতে পারে বিক্ষোভ-আন্দোলনের। অথবা বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীগুলো কীভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়ে, সেটাকে রূপান্তর করে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবে সে ব্যাপারে একটা সম্যক ধারণাও আমরা পাই এর থেকে।
২০১০ সালের পর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যে গণআন্দোলনের জোয়ার শুরু হয়। যার ফলে তিউনিসিয়া, মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে পতন ঘটে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের, আমাদের কাছে যেটা এখন আরব বসন্ত নামে পরিচিত, সেগুলোকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বায়াত তার বই Revolution without Revolutionaries-তে এক নতুন তাত্ত্বিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তার মতে, এই ঘটনাগুলো এক ধরনের ঐতিহাসিক বৈপরীত্যকে সামনে নিয়ে আসে। লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণে স্বৈরশাসকদের পতন ঘটলেও এই অভ্যুত্থানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বৈপরীত্য বোঝাতে বায়াত refolution ধারণাটি প্রস্তাব করেন—যা ‘reform’ এবং ‘revolution’ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। তার মতে, সমসাময়িক অনেক গণঅভ্যুত্থান পুরোপুরি বিপ্লবী প্রকল্প নয়, আবার স্রেফ সংস্কারবাদীও নয়। এগুলো এমন এক ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা যেখানে মানুষ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি তোলে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে নতুন কোনো বিপ্লবী রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণের সুসংগঠিত কোনো পরিকল্পনাও হাজির করে না। ফলে এই আন্দোলনগুলো অনেক সময় পুরনো শাসনের পতন ঘটাতে সক্ষম হলেও নতুন একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
কিন্তু তারপরও বায়াত কেন এগুলোকে বিপ্লবই বলছেন? সে ব্যাপারে এবটা ব্যাখ্যা আমরা পাই তার সাম্প্রতিকতম বইয়ে। বায়াত তার বিশ্লেষণের কেন্দ্রে বরাবরই রেখেছেন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে। Revolutionary Life: The Everyday of the Arab Spring (2021)-বইয়েও সেটার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এই বইয়ে তিনি আরব বসন্ত-পরবর্তী সমাজজীবনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেছেন। বায়াত দেখান, বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং নৈতিক অবস্থানকেও গভীরভাবে রূপান্তরিত করে। বিপ্লবের পর মানুষের জীবনে নতুন ধরনের প্রত্যাশা, সম্ভাবনা এবং দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে দৈনন্দিন বাস্তবতার সংঘাত, নতুন সামাজিক শক্তির উত্থান, এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরে রাজনীতির প্রবেশ—এসবকিছু মিলিয়ে বিপ্লবকে দেখতে হবে একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে। বায়াত দাবি করছেন, বিপ্লবকে কেবল একটা মুহূর্ত হিসেবে দেখলেই চলবে না। কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মুহূর্তটুকুই বিপ্লব নয়। বরং বিপ্লব একটা চলমান পক্রিয়া। অভ্যুত্থান পরবর্তী সমাজের দৈনন্দিন জীবনও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অর্থেই বায়াত একে বিপ্লব বলতে চান। এই আন্দোনগুলো রাষ্ট্রকাঠামো ও অভিজাততন্ত্রে প্রকৃত অর্থে কোনো মৌলিক সংস্কার বা আমূল রূপান্তর ঘটাতে না পারলেও সমাজ জীবনে এগুলো গভীর ছাপ রেখে যায়। অর্থাৎ একটা সামাজিক পরিবর্তন ঠিকই ঘটে। Revolution without Revolutionaries বইয়ে বায়াত যেখানে বিপ্লবী ফলাফল হিসেবে রাষ্ট্র, মতাদর্শ এবং শাসনকাঠামোর পরিবর্তনকে দেখছেন, এই বইয়ে বায়াত দাবি করছেন বিপ্লবের একটা সামাজিক দিকও রয়েছে। কেবল রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যেই বিপ্লব সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের একটা পরিবর্তন নিয়ে আসে বিপ্লব। পরিবর্তন আনে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র, প্রত্যাশা ও ক্ষমতা সম্পর্কের মাঝে। মাঠে-ঘাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে, পাড়া-মহল্লায় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে একটা রূপান্তর ঘটে যায়। বায়াতের মতে বিপ্লবকে বুঝতে তাই আমাদের নজর দিতে হবে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে। গণআন্দোলন ও বিপ্লবী অভ্যুত্থান নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় বায়াত এখানেই একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ হাজির করেন। চার্লস টিলি যেখানে বিশ্লেষণ করেছেন সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির (contentious politics) ধরন, কাঠামো ও সংগঠনের উপর, বায়াত সেখানে আলোকপাত করছেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ড কীভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠে তার উপর। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একুশ শতকের আন্দোলনগুলোকে বুঝতে। বিশেষ করে ইন্টারনেট ও সোসাল মিডিয়ার যুগে গণআন্দোলনগুলো কীভাবে গড়ে উঠছে, কেনইবা সেগুলো বিপ্লবী অর্থে আমূল রূপান্তর ঘটতে ব্যর্থ হচ্ছে সে ব্যাপারে আমাদের বোঝাপড়া তৈরি করতে একটা নতুন রাস্তা বায়াত আমাদের দেখাচ্ছেন। সে জায়গা থেকেই বায়াতের এই সাক্ষাৎকারটি একটা পরিচিতিমূলক কাজ করবে বলেই আশা করি।
সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। ঠিক যে সময় বাংলাদেশে দানা বাঁধছে জুলাই অভ্যুত্থান। সাক্ষাৎকারটিতে বায়াত আলাপ করেছেন নারীবাদী কর্মী ও লেখক ফিরোজেহ ফারভারদিনের সাথে। প্রকাশিত হয় International Research Group on Authoritarianism and Counter-Strategies (IRGAC)-তে। নাতি দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে বায়াতের চিন্তা ও কাজের সাথে একটা প্রাথমিক পরিচিতি ঘটে আমাদের। তিনি আলাপ করেছেন একুশ শতকের বিপ্লবগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এগুলোর ব্যর্থতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকেও আলোকপাত করেছেন বায়াত। একুশ শতকের অভ্যুত্থানগুলোতে বিপ্লবী উপাদান থাকলেও কেন এগুলো বিপ্লবী রূপান্তরে ব্যর্থ হচ্ছে সে ব্যাপারে বায়াত বেশ কতগুলো কারণ চিহ্নিত করেন, যেমন আন্দোলনের ধরনের দিক থেকে এই অভ্যুত্থানগুলো ছিল বিকেন্দ্রিভূত, বিশ শতকের বিপ্লবগুলোর মতো শক্ত ও সুনির্দিষ্ট কোনো নেতা এগুলোতে দেখা যায় না, আন্দোলনের কুশীলবদের মধ্যে বিপ্লবী কৌশল নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা যেমন ছিল না, তেমনই ছিল না ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কোনো ভিশন। আন্দোলনগুলোতে বিপ্লবী দাবি উঠে আসলেও, আন্দোলনে বিপ্লবী চেতনা থাকলেও, ছিল না অভিজাততন্ত্রের মূলোৎপাটন ও আমূল রূপান্তরের কোনো রূপরেখা। ফলে বিপ্লবের নেতৃত্ব ব্যর্থ হয় অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অভিজাততন্ত্র ও রাষ্ট্র তথা আমলাতন্ত্রকে মোকাবিলা করতে সত্যিকারের কোনো পরিবর্তন আনতে। যে কারণে বিপ্লবী রূপান্তরের প্রশ্নে এই ব্যাপক গণজোয়ার হয়ে পড়ে অকার্যকর। কিন্তু বায়াত এর মধ্যেও বিপ্লবী সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেন না, তিনি দেখতে চান সামাজিক স্তরে তা কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসছে কিনা। বিপ্লব, অভ্যুত্থান ও আন্দোলনের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক তৈরি করেই তাই আরব বসন্ততে তিনি বিপ্লব বলেই অভিহিত করতে চান। বায়াতের কাজ ও তাত্ত্বিক কাঠামো তাই আরব বসন্ত পরবর্তী অভ্যুত্থানগুলোকে বুঝতে আমাদের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলেই বোধ হয়।
অনুবাদ: তানভীর আকন্দ
মূল সাক্ষাৎকার
অধ্যাপক আসিফ বায়াতের সাথে সাক্ষাৎকারটিতে একুশ শতকের বিপ্লবী আন্দোলনগুলোর বৈশিষ্ট্য ও সেগুলোর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ করেছি। বিপ্লবী তৎপরতার উপর বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কী ধরনের প্রভাব পড়ছে সে প্রসঙ্গই মূলত উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারটিতে। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নয়া উদারবাদের ভূমিকা, কর্তৃত্ববাদী পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের নতুন নতুন ধরনের আবির্ভাব, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামাজিক আন্দোলনের পরিবর্তনশীল সম্পর্ক। আলোচনায় আরও উঠে এসেছে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি—বিশেষ করে, নজরদারি প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সামাজিক পরিবর্তনের উপর কী রকম প্রভাব তৈরি করবে সে বিষয়ও।
আমাদের সমাজ যে এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে সবাই একমত হবেন। বিগত দুই দশকে বর্জনপ্রক্রিয়া (process of excution) ও মারণরাজনৈতিক (necropolitical) শাসনব্যবস্থা তীব্রতর হয়েছে। এর ফলে প্রকৃতি ও সমাজের ধ্বংসলীলা আরও প্রকট হচ্ছে। ক্রমাগত অন্যায্যতর হয়ে উঠা এই দুনিয়ায় আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে অনিরাপত্তা, অনিশ্চয়তা এবং ভয়। ক্রমবর্ধমান সামাজিক আতঙ্কের প্রেক্ষিতে অতি-ডানপন্থী সরকার ও আন্দোলনসমূহের উত্থানের পাশাপাশি প্রাত্যহিক জীবনে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির বাড়বাড়ন্ত আবির্ভূত হয়েছে বৈশ্বিক হুমকি হিসাবে।
বাস্তবিক অর্থে, আমরা এমন এক কর্তৃত্ববাদী রূপান্তরের সাক্ষী, যা কেবল স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থারই একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যে । যুদ্ধবিরোধী ও ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদের বিরুদ্ধে চলমান দমন-পীড়ন থেকেই তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যদিও এই প্রক্রিয়াগুলোর সূচনা আরও কয়েক বছর আগে। একই সঙ্গে, বিশ্বজুড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসমৃদ্ধ অঞ্চলসমূহে বৃহৎ আকারের কর্তৃত্ববাদ ও উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন, বিপ্লব এবং স্বায়ত্তশাসিত রাজনীতির উত্থান ঘটছে। সহিংস দমন-পীড়নের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এই আন্দোলনগুলো আমাদের বর্তমান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিপ্লব ও সামাজিক আন্দোলন বিষয়ক একজন প্রথম সারির পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত আসেফ বায়াত। একুশ শতকের নতুন বিপ্লবী আন্দোলনগুলোর নির্ণায়ক বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর আলোকপাত করেন তিনি। একই সাথে বিশ শতকের বিপ্লবসমূহের সাথে এগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণও হাজির করেন এই সাক্ষাৎকারে।
ফারভাদিন: প্রফেসর বায়াত, আপনিতো গত ৪৫ বছর ধরে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিপ্লব এবং (নন-) মুভমেন্টগুলোর একজন একনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। বেশ গভীরভাবে সেগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন। সামাজিক রূপান্তর এবং উত্থানের গভীর ও বিশ্বাসযোগ্য বিশ্লেষণ হাজির করার জন্য সেগুলোর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলো নিরূপন করার চেষ্টা করেছেন। আপনার Revolution without Revolutionaries বইটিতে আপনি বিশ শতকের শেষ ও একুশ শতকের শুরুর দিককার দুটি বিপ্লবী মুহূর্তের তুলনা করেছেন। ১৯৭৯-এর ইরান বিপ্লব ও একুশ শতকের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া বিপ্লবসমূহ বিশেষ করে আরব বসন্তের শুরুর পর্যায় নিয়ে আপনি গবেষণা করেছেন। আপনার যুক্তি হচ্ছে, এই দুটি সময়কালের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বিশেষ করে, মতাদর্শ ও ভিশনের জায়গায়। আপনি বলছেন যে, প্রথমটিতে যেই আমূল পরিবর্তনকামী প্রতিজ্ঞা লক্ষ্য করা যায় পরেটিতে তার অভাব রয়েছে। এই ব্যাপারটি কি আরেকটু খোলাশা করতে পারবেন? বিশেষ করে এ দুটির মতাদর্শগত পার্থক্য নিয়ে আপনার বক্তব্য যদি আরেকটু বিস্তৃত করতেন।
বায়াত: সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি (contentious politics) বিষয়ে খোঁজখবর রাখে এমন যে কেউই স্বীকার করে, বৈশ্বিক পর্যায়ে বিগত দশক অর্থাৎ ২০১০-এর দশক ছিল জনসংগ্রামের ব্যপ্তি ও তীব্রতার বিচারে সাম্প্রতিক ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে সক্রিয় সময়, যার সূচনা হয়েছিল আরব বসন্তের উন্মোচনের মধ্যদিয়ে।
যৌবনকাল থেকেই বিপ্লবের ধারণা ও এর প্রয়োগ নিয়ে আগ্রহী ছিলাম আমি। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লব নিয়ে আগ্রহ ছিল ব্যাপক, যেখানে আমার আংশিক অংশগ্রহণ ছিল, পরবর্তীতে তা নিয়ে গবেষণাও করেছি আমি। যখন আমি আরব বসন্ত এবং সামগ্রিকভাবে ২০১০-এর দশকের ঘটনাবলির দিকে দৃষ্টিপাত করি, ইতিহাসের এই দুই অধ্যায়ের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য খেয়াল করি আমি। এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০১১ সালের বিপ্লবের আগে আমি দীর্ঘকাল মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে মিশরে বসবাস করেছি।
আন্দোলনের ধরন, পরিধি ও বিস্তার এসব বিচার করলে আরব বসন্ত ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর। এটা শুরু হয়েছে একটা দেশ থেকে। তিউনিশিয়া থেকে পরে তা সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এর সংখ্যা, জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ, এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটি ছিল সত্যিই দেখার মতো। বিপ্লব সম্পর্কে পূর্ববর্তী প্রচলিত ধারণা ছিল যে বিপ্লব একটি বিরল জিনিস, যেটা হরহামেশা ঘটে না। এ সমস্ত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে আরব বসন্ত। বিগত এক দশকে এটা কোনো বিরল বিষয় ছিল না, পরিস্থিতি এমন ছিল যে সবখানেই যেন এটা ঘটতে দেখছি আমরা। বিবিসির এক বামপন্থী সাংবাদিক এই বিষয়ে একটা বই লিখেছিলেন। বইটির শিরোনাম ছিল Why It’s Still Kicking off Everywhere: The New Global Revolutions।
আমার মতে বিশ শতকের বিপ্লব এবং যেগুলোকে আমি “একুশ শতকে নতুন প্রজন্মের বিপ্লব” নামে অভিহিত করি সেগুলোর মধ্যে বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, আন্দোলনের দিক থেকে এই নতুন প্রজন্মের বিপ্লবগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ এবং দর্শনীয়। কিন্তু অভিজাতগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আনতে এগুলো হতাশাজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিশ শতকের বিপ্লবগুলোতে যেরকম সংগঠন ও নেতৃত্ব ছিল এগুলোর ক্ষেত্রে মোটামোটিভাবে সেটার অভাব দেখা গেছে। অর্থাৎ, বিশ শতকের বিপ্লবগুলোতে আয়াতুল্লাহ খোমেনি বা ভ্যাক্লাভ হ্যাভেলের, ম্যান্ডেলা বা গান্ধীর মতো যেমন নেতাদের আমরা পেয়েছি, এই নতুন বিপ্লবগুলোতে সেরকম কোনো নেতা ছিল না। সংগঠনের দিক থেকে এগুলো ছিল অনেক বেশি আনুভূমিক। নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা একে অপরের সাথে সংযুক্ত ছিল। এবং অতি অবশ্যই বলতে হয় মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ও নন-মুভমেন্টের মাধ্যমেও যুক্ত ছিল অনেক মানুষ।
তৃতীয়ত, এই নতুন বিপ্লবগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্বসূরিও ছিল খুব কম। বড় বিপ্লবগুলোর অধিকাংশেরই কোনো না কোনো দর্শন ছিল, ভিশন ছিল, যেটা বিপ্লবীদের প্রভাবিত করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে তৎপর হতে যাতে সেই ভিশন তারা কার্যকর করতে পারে। এগুলোর অনেকগুলোই ছিল অবাস্তব, বেশ শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ক। এই নতুন দিনের বিপ্লবগুলোর জন্ম হয়েছে অভাবনীয় গণআন্দোলন থেকে, কিন্তু অধিকাংশক্ষেত্রেই এগুলো ব্যর্থ হয়েছে কোনো পরিবর্তন আনতে। যেই পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আন্দোলনকারীরা মাঠে নেমেছিল। সরকারের দায়বদ্ধতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং মর্যাদা, কোনোকিছুই অর্জিত হয়নি। সবশেষে উল্লেখযোগ্য হলো, পূর্ববর্তী বিপ্লবগুলোতে আমরা যেই আমূল সংস্কারের প্রতিজ্ঞা—যেমন, পুনর্বণ্টন, সম্পত্তি-সম্পর্কের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি দেখেছি সেটা নতুন দিনের বিপ্লবগুলোতে ছিল না। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জনতার যে ভিড় নেমে এসেছিল, তারা খাবার, চাকরি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সচনেতন ছিল। কিন্তু আমি মনে করি রাজনৈতিকশ্রেণি কেবল এ সমস্ত কথার সাথে গলাই মিলিয়ে গেছে, কিন্তু এসমস্ত দাবি কীভাবে পূরণ করা যায় সে বিষয়ে তাদের কোনো ভিশন ছিল না। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তারা বাজারের প্রামাণ্য ধরে নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমনটি হলো। একুশ শতকের বিপ্লবগুলোর বৈশিষ্ট্যে এই যে পরিবর্তন তাকে আমরা ব্যাখ্যা করব কীভাবে? প্রথমত, এটা স্বীকার করা ও দেখানো গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলো নতুন দিনের বিপ্লবী আন্দোলন ও অভ্যুত্থানেরই প্রতিনিধিত্ব করে। যারা মনে করে আরব বসন্তের বিপ্লব আসলে আমাদের পুরনো সময়েরই অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপের ১৯৮৯ সালের আপোষকামী বিপ্লবের ধারাবাহিকতা, তাদের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করি। হ্যাঁ, ১৯৮৯ সালের পূর্ব ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা ছিল “আপোষকামী বিপ্লব”। কিন্তু সেগুলো তাদের সমাজ, মতাদর্শ, অভিজাতশ্রেণি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসহ নানা কিছুর পূর্ণ রূপান্তর ঘটিয়েছিল। প্রায় সমস্তকিছুরই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছিল। আর এখানেই আরব বসন্তের সাথে সেগুলোর পার্থক্য। আরব বসন্ত পরিবর্তন এনেছে খুব সামান্যই। আন্দোলনের কুশীলবরা বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিয়েছিল। যদিও তারা রাজনৈতিক জবাবদিহিতা, সংকোচহীনতা, গণতন্ত্রায়ন, দমন-পীড়ন হ্রাস, মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো দাবিগুলো হাজির করেছিল। এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় দাবি। কিন্তু যেমনটি আমি বলেছি, পুনর্বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়নি। এই অর্থেই আমি বলছি যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পূর্ববর্তী বিপ্লবগুলোর তুলনায় এগুলো আমূল পরিবর্তনকামী ছিল না, যে বিপ্লবগুলো ছিল প্রবলভাবে বাম-জনবাদী (left populist), সমাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এবং বণ্টনবাদী।
আসল কথা হচ্ছে, এই নতুন বিপ্লবগুলো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে সংঘটিত হয়েছিল। আমি আমার বই Revolution Without Revolutionaries: Making Sense of the Arab Spring-এ এটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। এই বিপ্লবগুলো সংগঠিত হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর, উত্তর-সমাজতান্ত্রিক, উত্তর-উপনিবেশবাদী এবং উত্তর-ইসলামবাদী সময়ে। বিশ শতকে সমাজতন্ত্র, উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা এবং রেডিকেল ইসলামপন্থার মতো শক্তিশালী আন্দোলনগুলো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ধারণাকে বহন করত। কিন্তু ২০১১ সালে যখন আরব বসন্ত এলো, ততদিনে এই আন্দোলনগুলো এবং মৌলিক পরিবর্তনের পথ হিসেবে বিপ্লবের ধারণাটিই দুর্বল হয়ে পড়েছে অথবা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৮৯ সালের কমিউনিজম-বিরোধী বিপ্লবগুলো ‘বিপ্লব’ বলতে আমরা যা বুঝতাম, সেই ধারণারই অবসান ঘটিয়েছে। তাই আরব বসন্তের ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান যখন অনেককে বিস্মিত করছিল, তখন অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী খুব লোকের বিপ্লব নিয়ে কোনো রকম পূর্ব ধারণা ছিল। ফলে, আরব বিশ্ব এবং অন্যত্র যখন অভাবনীয় অভ্যুত্থান সফল হলো, তখন অভ্যুত্থানের অনেক কুশীলবই বিপ্লবের ধারণা ও পদ্ধতির সাথে সমন্বয় করতে পারেনি। বিদ্যমান অভিজাততন্ত্রের হাত থেকে কীভাবে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে হয় এবং রাজনীতি ও অর্থনীতি পরিচালনার নতুন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে হয় সে ব্যাপারে তারা মাথাই ঘামায়নি।
ফারভারদিন: কোনো একটা লেখায় আপনি বলেছিলেন, একুশ শতকে ‘রাজনীতির বাজারীকরণ’ কথাটা। প্রকৃতপক্ষে, এখন যা বললেন, বা আগেও কোনো লেখায় বলেছেন, তা মূলত নয়া উদারবাদী বিষয়ীকরণেরই (neoliberal subjectification) বর্ণনা। যা একুশ শতকের বিপ্লবী কুশীলবরা কীভাবে তাদের নিজের কর্মকাণ্ডকে কল্পনা বা যাপন করছে এবং অনুভব করছে সেটাকেই প্রভাবিত করে।
বায়াত: হ্যাঁ! আপনি ঠিকই ধরেছেন। ১৯৮৯ পরবর্তী বিপ্লব মূলত স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে নয়া উদারবাদের উত্থান ও বিস্তারের সাথেই তাল মিলিয়ে চলেছে। নয়া উদারবাদ পশ্চিম থেকে বিশ্বের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে, যদিও এর তীব্রতা, প্রভাব এবং পরিণতি ভিন্ন। এমনিতে, সাধারণ মানুষ নয়া উদারবাদকে তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিরোধ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যেমন, বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, অস্থায়ী চুক্তির বিরোধিতা করা, কিংবা অনানুষ্ঠানিক নির্মাণের উদ্দেশ্যে নগরভূমি পুনর্দখল করা। যদিও ঘটনা এমন না যে সাধারণ মানুষ অনিয়ন্ত্রিত বাজারের ভাষ্য বা সমাজের বাজারীকরণ সম্পর্কে আবশ্যিকভাবেই সচেতন থাকবে বা সে বিষয়ে তাদের বিশেষ আগ্রহ থাকবে, তবুও তারা তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এর যুক্তি ও পরিণতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে গেছে।
কিন্তু নয়া উদারবাদ কেবলই অর্থনৈতিক নীতি বা সবকিছুর বাজারীকরণই নয়। এটি এক ধরনের শাসনপ্রণালী হিসেবেও কাজ করে। আমাদের দুনিয়া সম্পর্কে চিন্তা করার ধরন, বিশ্ব কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কিত ধারণা, এমনকি আমাদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেও প্রভাবিত করে। এই অর্থে আমি মনে করি, নয়া উদারবাদী শাসনপ্রণালীর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাব বিরোধী রাজনৈতিক শ্রেণির উপর, সেইসব মানুষের উপর যাদের কথা আমরা শুনতে পাই, যারা চিন্তা ও কল্পনা করার কাজটি করে।
অন্যভাবে বললে, তারা বাজারীকরণ এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়েছে। তারা এ-ও বিশ্বাস করে নিয়েছে যে মৌলিক সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর, অথবা বিপ্লবের দিন পার হয়ে গেছে। কারণ বিশ শতকের বিপ্লবগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। ফলে, তারা বিপ্লবকে বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারেনি। একই কারণে ভবিষ্যত নিয়ে কোনো ইউটোপীয় ভিশনকেও তারা প্রশ্রয় দিতে চায়নি। তারা মূলত বর্তমানেই আবদ্ধ ছিল।
কিন্তু, আগেই যেমন বলেছি, আমরা জনগণ হিসেবে বিপ্লব সম্পর্কে যা-ই ভাবি বা না ভাবি, বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। মানুষ বিপ্লব নিয়ে না ভাবলেও বিপ্লব ঘটতে পারে। তবে বিপ্লব সম্পর্কে ধারণা থাকা বা না থাকার একটা বড় প্রভাব পড়ে বিপ্লবের ফলাফলে। এর মধ্যে দিয়েই আন্দোলনের কুশীলবদের কীভাবে অভ্যুত্থানকে পরিচালনা করা উচিত ছিল, কীভাবে উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে প্রয়োগ করা যেত পরিবর্তিত পরিস্থিতে, তারই একটা ব্যাখ্যা আমরা পাই। এই পরিস্থিতি বেশ চমকপ্রদ সব বিতর্ক হাজির করে সাম্প্রতিক বিপ্লবগুলো নিয়ে। অনেকেই এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চায় কিন্তু আমি আবশ্যিকভাবে একে ইতিবাচক হিসেবে দেখি না।
ফারভারদিন: আমার মনে হয় ইরানের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ। এই অভ্যুত্থান পরিচিত নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলন বা জিনা অভ্যুত্থান নামে। আপনি বলেছেন বিপ্লব ঘটে যেতে পারে, তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন বা তাকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন। জিনা আন্দোলনের ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লব বা আরব বসন্তের মতো পূর্ববর্তী ঘটনাগুলো মানুষকে প্রভাবিত করেছে এই্ আন্দোলনের কর্মীদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে। এই কারণেই তারা অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই একে কেবল একটি আন্দোলন বা অভ্যুত্থান না বলে “বিপ্লব” হিসেবে অভিহিত করছিল। অতীতের বিপ্লবগুলোর সম্মিলিত স্মৃতি ও চিত্র—ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটিই—আরেকটি বিপ্লব বা বিপ্লবী আন্দোলনকে উপলব্ধ করার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। আপনার একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, জিনা অভ্যুত্থান মূলত জীবন পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। আপনি এটিকে আরব বসন্তের প্রথম ঢেউয়ের সাথে তুলনা করেছিলেন, কিন্তু এটিকে সরাসরি একটি বিপ্লব বলা থেকে বিরত ছিলেন। আমি ২০২২ সালে ইরানের এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে আপনার মতামত শুনতে আগ্রহী।
বায়াত: অনেকগুলো প্রসঙ্গ টেনেছেন আপনি। তবে যেহেতু “জীবন পুনরুদ্ধার” (reclaiming life) প্রসঙ্গটি তুলেছেন, সেটা নিয়েই বলি প্রথমে। ইরানের ক্ষেত্রে এই “জীবন পুনরুদ্ধার”-এর ধারণাটি খুবই সুনির্দিষ্ট। ইসলামিক রিপাবলিকে ইসলামিক রাষ্ট্রের (বেলায়াত ই ফিকহ্) বিশেষ চরিত্রের কারণেই। রাষ্ট্রের চরিত্র ও ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণির মধ্যে পার্থক্যটা বোঝা জরুরি। আরব বসন্তের পূর্বের মিশর বা তিউনিশিয়ায় যে শাসকশ্রেণি ছিল তার থেকে ইরানে শাসকশ্রেণি অনেক আলাদা।
কারণ ইসলামি রিপাবলিকে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার (velayat-e faqih) যে বিশেষ প্রকৃতি রয়েছে তার সঙ্গে এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রের প্রকৃতি এবং ক্ষমতাশীন শাসকগোষ্ঠীর চরিত্রগত পার্থক্যগুলো দেখা গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের শাসকগোষ্ঠী বিপ্লব-পূর্ব মিশর বা তিউনিসিয়ার শাসকগোষ্ঠী থেকে অনেকটাই ভিন্ন; তাদের রাষ্ট্র প্রকল্পও আলাদা। আমি বলব, ইরানের শাসনব্যবস্থা নিজাম-ই-বেলায়ই বা বিলায়াত-ই-ফকিহ্ অনেকাংশেই সর্বস্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা কীভাবে চলবে, কী পরবে, কী শুনবে এইসব আরও অনেক কিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো খুবই সাধারণ দৈনন্দিন বিষয়। যেগুলোকে দুনিয়ার অনেক লোকই ভয়াবহ স্বৈরশাসনের অধীনে থেকেও মামুলি জ্ঞান করে। কিন্তু ইরানে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে এসবই রাজনীতির বিষয় ও ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।
ফলস্বরূপ, ইরানি শাসনব্যবস্থা—আমি বলতে চাই, বিলায়াত-ই-ফকিহ বা সর্বোচ্চ নেতার অধীনে অ-নির্বাচিত কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে এমন ধরনের ধর্মীয় ও সামরিক কর্তৃপক্ষ, যাদের মধ্যে জীবনকে রাজনৈতিক করে তোলার প্রবণতা রয়েছে। ফলে এখানে আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে মানুষ এর প্রতিক্রিয়ায় এইসব খবরদারি ও শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে তার জীবনকে মুক্ত করতে চাইবে। মোটা দাগে একেই আমি “জীবন পুনরুদ্ধার”-এর জন্য লড়াই বলছি। এবং এখানেই, আমি মনে করি, আরব বিশ্ব বা আরব বসন্তের সাথে এর পার্থক্য।
অন্য যে বিষয়টি আপনি তুলেছেন, সে প্রসঙ্গে বলতে গেলে—নারী, জীবন, স্বাধীনতা অভ্যুত্থানের মধ্যে বিপ্লবের ধারণাটি যে বিতর্কিত সে সম্পর্কে আপনি যা বলেছেন সেটা সম্ভবত সত্য। অন্যভাবে বললে, আপনি বলতে চাইছেন যে মানুষের সম্মিলিত স্মৃতি ও অতীত অভিজ্ঞতার কারণে তারা বিপ্লব নিয়ে ভাবছিল। এটাও বলে রাখতে চাই, যেহেতু ইরানের নারী, জীবন, স্বাধীনতা অভ্যুত্থানটি আরব বসন্তের প্রায় দশ বছর পরে ঘটেছিল, তাই ইরানি প্রতিবাদকারীরা সম্ভবত সেই অভিজ্ঞতার আলোকে একে দেখছিল। কিন্তু তাতেও এই অভ্যুত্থান বিপ্লব হয়ে উঠে না। আমার দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি বিপ্লবী অভ্যুত্থান, একটি বিপ্লবী আন্দোলন, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ অর্থে বিপ্লব নয়।
এক দিক থেকে দেখলে, এটি আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনীয়; কারণ সমাজের বিভিন্ন অংশ—যেমন শ্রমিক, নারী, যুবক, কৃষক, জাতিগত সংখ্যালঘু ইত্যাদি—একত্র হয়ে “জনগণ” নামে একটি ঐক্যবদ্ধ সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং মৌলিক কাঠামোগত রূপান্তর ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল। এই দিক থেকে এটি বিপ্লবী।
কিন্তু বিপ্লবী অভ্যুত্থানগুলো মিশর, তিউনিসিয়া এবং ইয়েমেনে যেরকম স্বৈরশাসকদের পতন ঘটিয়েছিল, ইরানে সেটা ঘটেনি। ইরানে শীর্ষ পর্যায়ে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; বরং এটি শাসনব্যবস্থাকে আরও আক্রমণাত্মক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক করে তুলেছে।
ফারভারদিন: তাহলে আপনার কথা অনুযায়ী কি আমরা বলতে পারি যে ২০২২ সালের জিনা বিপ্লবী অভ্যুত্থান প্রকৃতপক্ষে “বিপ্লবহীন বিপ্লবীদের” উদ্ভবের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ ছিল? আপনি একমত হবেন কিনা জানি না, তবে আমার মনে হয় জিনা অভ্যুত্থানে জিন, জিয়ান, আজাদি (নারী, জীবন, স্বাধীনতা) স্লোগানের মধ্যে একটা ভিশন কিন্তু ঠিকই ছিল। যদিও সেটা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। জনগণের মধ্যে একটা প্রগতিশীল অংশ আছে যারা এই স্লোগানকে ব্যাখ্যা করে দেহের স্বাধীনতা, সামাজ, গোষ্ঠী, জাতি এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে এক ভবিষ্যতের কল্পনা হিসেবে। সমাজের প্রতিশীল অনেকেই এই স্লোগানকে ব্যাখ্যা করেছে একরকম পরোক্ষ ভবিষ্যৎকল্পনা হিসেবে যেখানে দেহগত স্বায়ত্তশাসন, সামাজিক, জাতিগত-জাতীয় ও পরিবেশগত ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়েই আসলে জীবন পুনুরুদ্ধারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে তারা তাদের তৎপরতার কেন্দ্রে স্থাপন করেছে।
কিন্তু এই স্লোগানের একটি প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে; রাজতন্ত্রের সমর্থক ও জাতীয়তাবাদী বিরোধী শক্তিগুলো আছে, যারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অনুযায়ী স্লোগানটিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। এর সাথে তারা আরেকটি স্লোগানও জুড়ে দিচ্ছে,“মার্দ, মিহান, আবাদি” (যার আক্ষরিক অর্থ হলো “পুরুষ, মাতৃভূমি, এবং উন্নয়ন”)। নারী, জীবন, স্বাধীনতা—স্লোগানের এই অনুবাদ মূলত তাদের দৃষ্টিতে অতীতের যে মহিমা বিশেষত শাহ্-এর আমলকে ফিরিয়ে আনার কথা বলে। সুতরাং, তারা জীবনকে নয়, বরং অতীতকেই পুনরুদ্ধার করতে চায়।
আমি বলতে চাচ্ছি যে, জিনা অভ্যুত্থানের সময় একটি পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বা এখনো আছে। এবং তা অন্তত বাচনিক স্তরে রাজনৈতিক বিকল্পের কথা বলছে এবং এবং উত্তর-ইসলামী রিপাবলিকের কিছু বিশেষ ভিশন তুলে ধরছে।
বায়াত: আপনার বক্তব্য বেশ স্পষ্ট। এটা বলা যেতে পারে যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী নানা জনের নানা দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। কিন্তু সেটি ঠিক কী ছিল আমরা জানি না, কারণ এটা গবেষণা সাপেক্ষ বিষয়। হ্যাঁ, কিছু মানুষ হয়তো নারী, জীবন, স্বাধীনতা স্লোগানটিকে আপনার প্রস্তাবিত অর্থে ব্যাখ্যা করেছে—খুবই বিতর্কিত ও পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে। কিন্তু এরাতো স্রেফ দুটি গোষ্ঠী যাদের কথা আমরা শুনেছি। বাকিদের সম্পর্কেতো আমরা জানিই না। আমার মনে হয় জনগণের চাহিদা কী ছিল সে বিষয়ে আমরা একটা ইঙ্গিত পেতে পারি কেন অভ্যুত্থানটি হয়েছে তার উত্তরে যে হাজার হাজার টুইট হয়েছে সেখান থেকে। এর ভিত্তিতেই আমি বলেছিলাম ‘জীবনের পুনরুদ্ধার’ একটা মূল দাবি ছিল, কিন্তু নারীর প্রশ্নটাই বেশি প্রকাশ পেয়েছে। এই অর্থে বলা যায় আন্দোলনটিতে একটা জোরালো নারীবাদি কণ্ঠস্বর ছিল। আমার মতে এসবকিছুর উদ্ভব ঘটেছে ইরানি শাসনব্যবস্থার বিশেষ স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র থেকে, যেটা নানাভাবেই জীবনকে উপনিবেশিত করেছে, যেই জীবনের একটা কেন্দ্রীয় অবস্থানে আছে নারীরা।
এটা ঠিক, ভবিষ্যত পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের বিশেষ ভিশন থাকতে পারে। কিন্তু আমি সেই ভিশনের একটা সুস্পষ্ট প্রকাশিত রূপ দেখতে চেয়েছিলাম। সেগুলোকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা দরকার ছিল যাতে এগুলোকে বোধগম্য ভাষায় অনুবাদ করা যায়, যে ভাষা অধিকাংশ মানুষ বুঝতে পারবে, এবং এর সাথে নিজেকে মেলাতে পারবে।
যাতে সেগুলোকে এমন এক বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য ভাষায় অনুবাদ করা যায় যা অধিকাংশ মানুষ বুঝতে পারে এবং যার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারে। ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবেও মানুষ তাদের ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি বড় স্লোগানের মধ্যে কল্পনা করেছিল—“স্বাধীনতা, মুক্তি, এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র”। কিন্তু সেটি ছিল কেবল একটি কল্পনা, কোনো সুস্পষ্ট প্রকাশ নয়। এটি ছিল একটি কল্পিত দৃষ্টিভঙ্গি (রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাব থেকে স্বাধীনতা), কিন্তু ইসলামপন্থী বিপ্লবী নেতাদের মনে ভিন্ন কিছু ছিল। ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবেও মানুষ ভবিষ্যতের ভিশন কল্পনা করেছিল সেই মূল স্লোগানটিতে, “স্বাধীনতা, মুক্তি ও ইসলামিক রিপাবলিক”। কিন্তু সেটা নিছক কল্পনাই ছিল, তার সুস্পষ্ট কোনো প্রকাশ ছিল না।
ফারভারদিন: সে কারণেই আমি বলছি তারা আসলে বিপ্লবহীন বিপ্লবী।
বায়ত: হুম। এক অর্থে সেটা বলাই যায় ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা যেহেতু ছিল না। তবে বিপ্লবের জন্য পদ্ধতি, রিসোর্স ও রাজনৈতিক পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব সে ব্যাপারে কৌশলগত ভিশনও দরকার। এগুলোরও অভাব ছিল সেখানে। আরব বসন্ত যেমন একটা বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, অনেক ক্ষেত্রে স্বৈরশাসকদের পতন ঘটিয়েছিল, ইরানের নারী, জীবন ও মুক্তি সে পর্যায়েও পৌঁছাতে পারেনি।
ফারভারদিন: Revolution Without Revolutionaries যখন লিখেছিলেন তারপরতো অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। আরব বসন্তের দ্বিতীয় জোয়ার আমরা দেখেছি এই অঞ্চলে, আমেরিকায় হয়েছে ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার আন্দোলন। চিলে ও আর্জেন্টিনায় সরকারের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন হয়েছে যার মূল কুশীলব ছিল নারীবাদিরা। ২০১৭ থেকে ইরানে আন্দোলনের নতুন জোয়ার শুরু হয়েছে, যার পরিণতি আমরা দেখেছি জিনা অভ্যুত্থানে। এর মধ্যেইতো আমরা সেটা নিয়ে আলাপ করলাম। অতি সম্প্রতি শুরু হয়েছে উপনিবেশ ও যুদ্ধ বিরোধী আন্দলনের নতুন জোয়ার। একই সাথে আমরা দেখতে পেয়েছি ইজরায়েলের ফিলিস্তিন আক্রমণের প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান কর্মসূচি। আরও অনেক উদাহরণ আছে। Revolution Without Revolutionaries যদি নতুন করে লিখতেন তাহলে কি আপনার বক্তব্য এখন ভিন্ন হতো? এক দশক আগের পরিস্থিতি ও বর্তমান পরিস্থিতির মাঝে কোনো বিশেষ পার্থক্য কি আপনি দেখতে পান?
বায়াত: ভালো প্রশ্ন করেছেন। আমিতো মনে করি এই কালিকতার ব্যাপারটিই ভাবনার মূল বিষয়। চৌদ্দ বছর সময়কালের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিপ্লবগুলো নিয়ে আমরা কথা বলছি, কথা বলছি ২০১১ সাল থেকে ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থান নিয়ে। এটা খুব স্পষ্ট যে এক দেশে ঘটে যাওয়া বিপ্লবের ঘটনাগুলো অন্য দেশের অভ্যুত্থানগুলোকেও প্রভাবিত করে। বিশেষ করে, বর্তমান বিশ্বে, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই ভালো, মানুষ প্রকৃত অর্থেই খবরাখবর রাখে। ফলে, মানুষ একে অন্যের থেকে যেমন শিখছে, শাসকগোষ্ঠীরাও শিখছে আন্দোলন কীভাবে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এখন আমি মনে করি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া বিপ্লবী আন্দোলনগুলো বিভিন্ন দেশে একপ্রকার “ঘটনা”র জন্ম দিচ্ছে। এগুলো আত্মসচেতনতার ধরন বদলে দিচ্ছে, জন্ম দিচ্ছে নতুন প্রথা ও অভিজাতগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিকল্প বয়ানের। এই অর্থে এই আন্দোলনগুলো সমাজে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসছে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী ও অভিজাততন্ত্র ঠিকই তাদের ক্ষমতা বজায় রেখেছে। অন্যভাবে বললে, এই আন্দোলনগুলো সমাজকে বদলে দিচ্ছে কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো বদলাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, এই আন্দোলনগুলো যে কেবল শাসকগোষ্ঠী ও অভিজাতদের ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থই হচ্ছে তা নয় বরং তাদেরকে করে তুলছে সন্ত্রস্ত্র ও আরও বেশি নিরাপত্তা সচেতন। ফলে, এর প্রতিক্রিয়ায় অভিজাততন্ত্র আন্দোলন দমন ও সামাজিক পরিবর্তনকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে অস্বাভাবিক সব উপায় অবলম্বন করছে। বিপ্লবী আন্দলোন ও অভ্যুত্থান মানুষের আচরণ ও বয়ানে যে পরিবর্তন এনেছে সেটাকেও নিষ্ক্রিয় করতে তারা উদ্ধত। অন্যভাবে বললে, অভিজাত ও শাসকগোষ্ঠীর সাথে সমাজের বয়ানে অস্বাভিক এক বিরোধ লক্ষ্য করছি আমরা। সে বিবেচনায়ই আমি বলি আমরা গ্রামসি-উত্তর এক সময় প্রত্যক্ষ করছি। অর্থাৎ, পুরনো পশ্চিমা লিবারাল গণতন্ত্রে যেমন নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ফারাক থাকবার কথা নয়, সেই পরিস্থিতি এখন পাল্টে যাচ্ছে। লিবারাল গণতন্ত্রের আধিপত্য ভেঙে পড়ছে। রাষ্ট্র ও অভিজাতগোষ্ঠী মনে করছে তারা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। প্রচলিত বয়ানের উপর তারা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, কারণ মানুষ এখন আর এসব খাচ্ছে না। মানুষ এখন বিকল্প তৈরি করছে নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মিডিয়ার মাধ্যমে। যার ফলে অভিজাতগোষ্ঠী ও রাষ্ট্র আইনের কড়াকড়ি ও পুলিশি সহিংসতার উপর ভর করছে। সফট পাওয়ার কাজ না করলে আপনি হার্ড পাওয়ারের দিকেই যাবেন, আইনি কৌশল ও পুলিশি সহিংসতার উপর নির্ভর করবেন। সংক্ষেপে বললে, এই লিবারাল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ক্রমাগত স্বৈরাচারী ও দমনমূলক হয়ে উঠছে। তারা হয়ে উঠছে গ্লোবাল সাউথের দমনমূলক রাষ্ট্রগুলোর মতো। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যেই রাষ্ট্রগুলোর সমালোচনায় তারা এক সময় মুখর ছিল।
ফারভারদিন: আপনি এর আগে সাধারণ মানুষের নন-মুভমেন্ট বা নীরব অনুপ্রবেশের (quite encroachment) কৌশল নিয়ে লিখেছেন। যেহেতু কিছু ক্ষেত্র থাকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যদি ভুল না করে থাকি, আরব বসন্তের সম্ভাবনাময় পরিস্থিতি নিয়ে একই রকম যুক্তি আপনি দিয়েছিলেন। অন্যভাবে বললে, আপনার যুক্তি ছিল প্রাত্যহিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে প্রতিহত করতে কিছু মাত্রায় অস্পষ্টতা জরুরি। নজরদারি প্রযুক্তি ও কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতি বিবেচনা করলে বর্তমান যে পরিস্থিতি সেখানে নিপীড়নের এসকল নতুন প্রযুক্তি হয় সারা দুনিয়াব্যাপী রপ্তানি করা হচ্ছে অথবা সেখানেই তৈরি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, সার্বিকভাবে নন-মুভমেন্ট বা সমাজের তলা থেকে সামাজিক রূপান্তরের ভবিষ্যতকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বায়াত: আগেই যেমনটা বলেছি, অভিজাতগোষ্ঠীর বয়ান আর প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। সেটা অর্থনীতির ক্ষেত্রেই হোক বা দুর্নীতি অথবা গাজায় ইজরায়েলের যুদ্ধের ব্যাপারেই হোক। এর একটা কারণ তথ্যের বিকল্প উৎস ও যোগাযোগের নতুন মাধ্যম তৈরি হওয়া। কিন্তু এসকল নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলোর স্ববিরোধী প্রভাব রয়েছে। এগুলো যেমন প্রতিবাদী আন্দোলনগুলোকে সাহায্য করছে, অভিজাতদের সহায়ক হয়ে উঠছে আরও বেশি পরিমাণে। হ্যা, একুশ শতকেই একটা সময় আমরা পার করেছি যখন রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সেগুলোর সম্ভাবনাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। এগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করবে সে ব্যাপারে অনেকেই ছিল অপ্রস্তুত। কিন্তু রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই শিখে নিয়েছে এই নতুন প্রযুক্তিগুলোকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় জনগণকে প্রভাবিত করার কাজে, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে। এখন তারা প্রচুর পয়সা ঢালছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে, এগুলোকে ব্যবহার করে ক্ষমতার পুনরুৎপাদন করতে। এবং বিগত দশকে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে এসমস্ত উন্মুক্ত ক্ষেত্র বা অনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো রাষ্ট্রের তথ্যভাণ্ডারের অধীনে চলে আসার নজির আমরা দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেগুলোর বিভিন্ন তথ্য তারা সংগ্রহ করছে এগুলোকে ডিজিটালাইজড করছে। এগুলো হচ্ছে খুব সম্ভবত নিম্নবর্গীয় সমাজে যেখানে অস্বচ্ছতা এসমস্ত প্রাত্যহিক সংগ্রামের অনুকূলে কাজ করে, সেসব জায়গায় নন-মুভমেন্ট ও নিম্নবর্গীয় প্রতিরোধকে ঠেকিয়ে রাখতে।
এখন রাষ্ট্র স্বয়ং এসমস্ত অনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে অনুপ্রবেশ করছে সেগুলোকে উপনিবেশিত করতে, নিয়ন্ত্রণ করতে। অনেক জায়গায়ই, যেমন মিশরে, অপ্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠীগুলোর তথ্যের ডিজিটালাইজেশানের ফলে নিয়ন্ত্রণের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে এসব জায়গায় তথ্যে উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল কেবল জনগণের। কিন্তু এখন রাষ্ট্র এসব জায়গায় মানুষের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনেক বেশি অবগত হচ্ছে। বাসিন্দাদের নিজেদের নাম, ঠিকানা, করারোপের উদ্দেশ্যে আয়ের হিসাব, ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করতে হচ্ছে। এর আগে পরিস্থিতি এরকম ছিল না, যেহেতু আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ তারা ছিল না। এই পরিবর্তনের একটা বড় প্রভাব হয়তো পড়ছে এ সমস্ত এলাকায় গরীব লোকের সংগ্রামের ভূমিকা ও কার্যকারিতার উপর।
আমি মনে করি এই নতুন অগ্রগতি সম্পর্কে আমাদের গবেষণা ও চর্চা করা জরুরি। তারপরও, আমি বলব যে, অভিজাতগোষ্ঠী যদি এসমস্ত মুক্ত অঞ্চলগুলোকে সীমাবদ্ধ করে তুলতে সক্ষম হয়, নন-মুভমেন্ট ও প্রাত্যহিক প্রতিরোধের কার্যকারিতাকে সীমিত করে তুলতে পারে, তাহলে রাস্তার রাজনীতি আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ নিম্নবর্গীয় গোষ্ঠীগুলোর ক্ষোভ প্রকাশ ও দাবি উত্থাপনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে রাস্তা। এটা নন-মুভমেন্টের চরিত্রকে পাল্টে দিবে। তা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম (Direct action)-কে পরিণত করবে প্রতিবাদের রাজনীতিতে। অর্থাৎ, দাবি আদায়ের জন্য কর্তৃপক্ষকে চাপ দেয়ার জন্য আন্দোলনে নামবে তারা। যেহেতু সরাসরি উদ্দেশ্য সাধনের কোনো পথ আর খোলা থাকবে না।
ফারভারদিন: অর্থাৎ আপনি বলবে চাচ্ছেন বিপ্লবের সম্ভাবনা এখন আগের চেয়েও বেশি।
বায়াত: আমার মনে হয় রাস্তার রাজনীতি, বিদ্রোহ এমনকি দাঙ্গার মধ্যে আমরা আরও বেশি প্রণোদনা খুঁজতে পারি। এখন, এমন পরিস্থিতিতে, যদি অন্যান্য সামাজিক শ্রেণিও এর সাথে জড়িত হয়, তাহলে সম্ভাবনা আছে বৃহৎ আন্দোলন ও বিক্ষোভের। অবশ্য এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। এটা নির্ভর করে অনেকগুলো আকস্মিক ঘটনার উপরও, রাষ্ট্র কেমন আচরণ করছে সেটার উপরও। এর ফলে রাষ্ট্র কি নিজেকে পরিবর্তন করবে না দমন-পীড়নমূলক হয়ে উঠবে? কিন্তু সামাজিক উত্থানের সম্ভাবনা কিন্তু এর ফলে বৃদ্ধি পায়ই।
ফারভারদিন: কিন্তু সেটা বাধ্যতামূলকভাবে ইতিবাচক উত্থানই যে হবে তাতো না। এটা ফ্যাসিবাদেরও উত্থান ঘটাতে পারে।
বায়াত: এখানেই ভিশনের কথাটি আসে—নেতৃত্বের ধারণা, সংগঠনের ধারণা এবং সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে মানুষ কী চায়, এবং তার ভিশন কতটা মুক্তিকামী। আজকের দিনে, আমরা কেমন ভবিষ্যৎ দেখতে চাই সেই ভিশন থাকাটা আগের চেয়েও আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফারভারদিন: এই পর্যায়ে তাহলে ‘আশা’ নিয়ে আলাপ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। ভিশনের সাথে স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যভাবে বললে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে আমাদের আশা। এই আশা নিয়ে আপনার ভাবনা কী? আমাদের সময়ে এটা প্রকাশিতইবা হতে পারে কীভাবে?
বায়াত: আশাকে ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত করা হয় অনেক সময়ই, কিন্তু আমার মতে এর সাথে অতীতেরও সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের অতীতের কর্মকাণ্ড ও অর্জন, ভবিষ্যতে কী সম্ভব সে ব্যাপারে আমাদের ধারণাকে রূপায়িত করে। ব্যক্তিগতভাবে, আশা নিয়ে যখন আমি ভাবি, তখন আমার মনে পড়ে যৌবনে আমার পাহাড়ে হেঁটে বেড়ানোর কথা। উপরে তাকিয়ে যখন দেখতাম পাহাড়ের চূড়া অনেক দূরে আমার খুব ক্লান্ত ও হতাশ লাগত। তবে, চূড়ায় পৌঁছানো কতটা দুরূহ সেখানে মনোযোগ না দিয়ে আমি বরং নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতাম কতদূর উঠে এসেছে আমি এর মধ্যেই। এর ফলে আমার মধ্যে সাহস তৈরি হতো, এতদূর যখন উঠে আসতে পেরেছি, আরও দূর উঠতে পারারতো কোনো কারণ নেই। একইরকমভাবে, আশার সাথে আমাদের অতীতের অর্জন ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক রয়েছে। অতীত পর্যালোচনা করে, আমরা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ভাবতে পারি, নতুন কৌশল খুঁজতে পারি, এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে পারি। আমার কাছে, এই সম্ভাবনাগুলো কল্পনা করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করাটাই হচ্ছে আশার জায়গা।
