কাফকা ও তার পূর্বসূরিগণ

অনুবাদের ভূমিকা

হোর্হে লুইস বোর্হেস গল্পকার হিসেবে পরিচিত আমাদের কাছে। লাতিন আমেরিকান এই সাহিত্যিক তার গল্পে এমন এক জগৎ নির্মাণ করেন তা শুধু আমাদের কল্পনাশক্তিকেই চ্যালেঞ্জ করে তাই না, বরং উলট-পালট করে দেয় আমাদের বাস্তবতার যৌক্তিক কাঠামো। বোর্হেস আমাদের ভাবায়, জগতকে দেখার যে দৃষ্টি, সেটাকে পাল্টে দিতে চায়। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো লিখেছিলেন, বোর্হেসের গল্প পড়ে তার মধ্যে প্রচণ্ড হাসির উদ্রেক হয়। এ হাসি বিস্ময়ের। জগতকে নতুন করে দেখতে পারার বিস্ময়। সেই বিস্ময় থেকেই জন্ম নেয় ফুকোর বিখ্যাত বই The Order of Things: An Archaeology of the Human Sciences। বোর্হেসের এই আশ্চর্যজনক চিন্তা ও কল্পনাশক্তি আমরা যে কেবল তার গল্পের মধ্যেই দেখি তাই না, বরং দেখি তার সাহিত্যপাঠ ও সমালোচনার মধ্যেও। বোর্হেস এই ছোট নিবন্ধটি লেখেন ১৯৫১ সালে। চেক কথাসাহিত্যিক ফ্রানৎস কাফকার উপর একটা গবেষণার পরিকল্পনার কথা বলে প্রবন্ধটি শুরু করে বোর্হেস। অর্থাৎ সেই গবেষণাটি আর কখনোই সম্পূর্ণ হয়নি সেটার ইঙ্গিত দিয়ে লেখাটি শুরু হয়। এই প্রথম বাক্যটির মধ্য দিয়েই বোর্হেস যেন বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছেন এ লেখায় আসলে কী অনুসন্ধান করতে চাচ্ছেন তিনি। গবেষণাটি কখনোই সম্পূর্ণ হয়নি আমরা ধরে নিতে পারি। কিন্তু বোর্হেস সেই অসম্পূর্ণ গবেষণার বিষয়বস্তুই উপস্থাপন করছেন আমাদের সামনে। বোর্হেস দেখাতে চান কাফকার লেখায় এক প্যারাডক্সিকেল ব্যাপার আছে। এই প্যারাডক্স বরাবরই কাফকার লেখায় থিম আকারে হাজির হয়। বোর্হেস এই থিম ধরেই খুঁজতে চান কাফকার পূর্বসূরিদের। বেশ কিছু নজির তিনি হাজির করেন বিভিন্ন সময়ের লেখকদের মধ্য থেকে। যেখানে এই প্যারাডক্স খুঁজে পাওয়া যায়। কাফকার পূর্বসূরিদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে বোর্হেস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, একটা লেখা আমরা কীভাবে পাঠ করি? কোনো লেখক যে শুধু তার উত্তরসূরিদের প্রভাবিত করে তাই না, বরং সে প্রভাবিত হয় তার উত্তরসূরিদের দ্বারাও। বোর্হেস ব্রাউনিংকে যেভাবে পাঠ করছেন বা পাঠ করছেন ডানসানিকে, সেটা কখনোই সম্ভব হতো না যদি না তাদের পরে কাফকা লিখত। কাফকা পড়ার অভিজ্ঞতা আমাদের ব্রাউনিং বা ডানসানিকে পড়ার অভিজ্ঞতাকে পাল্টে দেয়। তৈরি হয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। অর্থাৎ এই পাঠে লেখকের সময় এবং প্রেক্ষাপটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে পাঠকের সময় এবং প্রেক্ষাপট। বোর্হেস সে বিষয়ে সচেতন থেকেই কাফকার পূর্বসূরিদের পড়ছেন এমনভাবে, যেভাবে হয়তো কাফকা নিজেও পড়েননি। আর সে অর্থেই বোর্হেস বলতে চাচ্ছেন, প্রত্যেক লেখকই কেবল যে তার উত্তরসূরি তৈরি করেন তাই না, বরং তৈরি করেন পূর্বসূরিও, সচেতন বা অসচেতনভাবে। এই পূর্বসূরিরা তৈরি হয় পাঠকের অভিজ্ঞতায়। বোর্হেস এখানে উপস্থাপন করছেন এক বিশেষ পাঠপদ্ধতি, যেই পাঠপদ্ধতি পাল্টে দিতে পারে আমাদের পাঠের অভিজ্ঞতা।

অনুবাদ: তানভীর আকন্দ
মূল প্রবন্ধ

কাফকার পূর্বসূরিদের উপর একটা গবেষণা করার পরিকল্পনা করেছিলাম এককালে। প্রথমে ধারণা ছিল কাফকা অলঙ্কৃত স্তুতিবাক্যে ঘেরা ফিনিক্সের মতোই অনন্য। কিন্তু আরেকটু এগোতেই মনে হলো বিভিন্ন সময়ের বিচিত্র সব সাহিত্যকৃতির মাঝেই কাফকার সুর ও প্রবণতাগুলো দেখতে পাচ্ছি। সেগুলোর কয়েকটি এখানে ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করছি। 

প্রথমত গতি বিষয়ক জেনোর প্যারাডক্স। ‘ক’ থেকে ‘খ’ অবস্থানে গতিশীল একটি বস্তু কখনোই পৌঁছাতে পারবে না (এরিস্টটলের বর্ণনা অনুযায়ী) কেননা সে দূরত্ব পেরুতে হলে আগে মোট দূরত্বের অর্ধেক দূরত্ব তাকে অতিক্রম করতে হবে। তারও আগে পেরোতে হবে সেই অর্ধেকেরও অর্ধেক দূরত্ব, তার আগে সেই অর্ধেকের অর্ধেকেরও অর্ধেক দূরত্ব আর এভাবেই অসীম সংখ্যক অর্ধেক দূরত্ব তাকে পেরুতে হবে। এই বিখ্যাত সম্পাদ্যের কাঠামোটিই সত্যিকার অর্থে আমরা পাই The Castle-এ। গতিশীল বস্তু, তীর ও একিলিসই হচ্ছে সাহিত্যের প্রথম কাফকাসদৃশ চরিত্র। দ্বিতীয় যে লেখাটি ভাগ্যক্রমে আমার সামনে এসে পড়ে তার প্রবণতা ঠিক কাঠামোগত নয় বরং ভাবগত। নবম শতাব্দীর গদ্য লেখক হান ইউ-এর একটি উপকথা। যেটি মারগিউলিসের অসাধারণ একটি বই Anthologie raisonnée de la littérature chinoise (1948)-এ পেয়েছি। রহস্যময় ও গম্ভীর এই অনুচ্ছেদটির উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

সার্বজনীনভাবে ইউনিকর্নকে মঙ্গলের প্রতিকরূপেই ভাবা হয়। সব গল্প,গাথা, মনীষীর জীবনী ও অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ লেখায় এমনটিই বলা আছে। এমনকি গ্রাম্য মহিলা এবং শিশুরাও জানে ইউনিকর্ন শুভলক্ষণ বহন করে। কিন্তু এই প্রাণী কখনোই গৃহপালিত পশুগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় না, বেশিরভাগ সময়েই সে দুর্লভ, সহজে শ্রেণীবিন্যস্তও করা যায় না একে। ইউনিকর্ন না দেখতে ঘোড়ার মতো, না ষাড়ের মতো, নেকড়ে বা হরিণের মতোও না। এমতাবস্থায় ইউনিকর্নের মুখোমুখি হলে এটা ঠিক কী ধরনের প্রাণী তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে না। কেশর আছে এমন প্রাণীকে আমরা ঘোড়া বলে চিনি আবার শিংওয়ালা প্রাণীকে ষাঁড় বলে ডাকি। কিন্তু আমরা জানি না ইউনিকর্ন আসলে ঠিক কীসের মতো।[১]

তৃতীয় লেখাটা অধিকতর সহজলভ্য উৎস, কিয়ের্কেগার্দের রচনাবলি থেকে পাওয়া। এই দুই লেখকের মধ্যে আত্মিক যোগসূত্র কেউ অস্বীকার করতে পারবে না; যতদূর জানি, কাফকা যে কিয়ের্কেগার্দের মতোই সমসাময়িক সময় ও পুঁজিবাদী সমাজকে উপজীব্য করে প্রচুর ধর্মীয় নীতিগল্প লিখেছেন, এই ব্যাপারটা এখনো গুরুত্বের সাথে দেখা হয়নি।

 লওরি (Walter Lowrie) তার  কিয়ের্কেগার্দ (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৩৮) বইয়ে এ দুটি নীতিগল্পের উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি এক নকলবাজের গল্প যে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে নিরবিচ্ছিন্ন নজরদারির মাঝে ব্যাংক নোট পরীক্ষা করে থাকে। একইভাবে ইশ্বরও কিয়ের্কেগার্দের অবিশ্বাসবশত তাকে বাধ্য করতে পারেন কিছু করতে, বিশেষকরে যখন ইশ্বর জানেন যে অশুভ শক্তির সাথে কিয়ের্কেগার্দের পরিচিতি আছে। আরেকটি যে নীতিগল্পের কথা বললাম তার বিষয় হচ্ছে উত্তরগোলার্ধ অভিযান। ড্যানিশ মন্ত্রীপরিষদ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে,  এই অভিযানে অংশগ্রহণ করলে আত্মার চিরন্তন মঙ্গল হবে। যদিও এটা স্বীকার করা হচ্ছে যে, সেখানে পৌছানো বেশ দুঃসাধ্য এমনকি প্রায় অসম্ভব। অভিযানে অংশ নেয়া সবার পক্ষেই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। শেষপর্যন্ত তারা ঘোষণা করে ডেনমার্ক থেকে লন্ডন পর্যন্ত যে কোনো পথেই ভ্রমণ, এমনকি নিয়মিত আসা যাওয়া করে এমন স্টিমারে যাত্রাও, উত্তরগোলার্ধ অভিযান হিসেবে বিবেচিত হবে। 

চতুর্থ যে আদিসংস্করণটি পেয়েছি তা ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত  ব্রাউনিং-এর একটি কবিতা “Fears and Scruples”। একব্যক্তির, অন্তত তার নিজের ধারণা অনুযায়ী—তার এক বিখ্যাত বন্ধু আছে। যাকে সে কখনোই দেখেনি, এবং যার কাছ থেকে কোনোরূপ সাহায্য পাওয়ারও সম্ভাবনা তার নেই। কিন্তু সে জানে তার বন্ধুটি মহৎগুণের অধিকারী, এবং অন্যদের সে বন্ধুর লেখা চিঠি দেখিয়ে বেড়ায়। কেউ কেউ সেই বন্ধুটির মহৎগুণের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে, হস্তলিপি বিশারদগণ ঘোষণা করে যে চিঠিগুলো ভুয়া হতে পারে। শেষ লাইনে লোকটি প্রশ্ন তুলে: “এই বন্ধুটিই যদি হয়ে থাকে…ঈশ্বর?”

আমার নোটে আরও দুটি গল্প টুকে রাখা আছে। একটা লিও ব্লয়ের (Léon Bloy) Histoires désobligeantes থেকে নেয়া, সেইসব লোকদের বিষয়ে যারা সারাজীবন ধরে বিভিন্ন ধরনের গ্লোব, মানচিত্র, রেলরোডের সময়সূচি এবং ট্রাঙ্ক  সংগ্রহ করতে থাকে কিন্তু তাদের জীবন পার হয়ে যায় এমনকি নিজের শহরেরও বাইরে না গিয়েই। অন্যটির শিরোনাম “Carcassonne”,  লর্ড ডানসানির (lord dunsany) লেখা। অপারেজয় এক সৈন্যদল অসীম দুর্গ থেকে যাত্রা শুরু করে, পাহাড়-মরুভূমি পেড়িয়ে, ভয়ঙ্কর সব দানবের মোকাবেলা করে রাজ্যজয় করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে কিন্তু কোনোদিনই কারকাসনে পৌঁছাতে পারে না। যদিও দূর থেকে কেবল একনজর দেখার সুযোগ পায়। (স্পষ্টতই গল্পটি প্রথমটির থেকে বিপরীত, একটাতে কখনোই শহর ত্যাগ করা হয় না, অপরটাতে সেখানে কখনোই পৌঁছানো হয় না)

যদি খুব বেশি ভুল না করে থাকি, যেসব বিচিত্র উদাহারণ হাজির করলাম সেগুলোর সাথে কাফকার সাদৃশ্য পাওয়া যায় এবং এগুলোর একটার সাথে আরেকটা বৈশাদৃশ্যপূর্ণ। দ্বিতীয় বিষয়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটা লেখায়ই কমবেশি কাফকার ভাবাদর্শ খুঁজে পাওয়া যায়। কাফকা না লিখলে আমাদের পক্ষেও এই বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারটা আবিষ্কার করা সম্ভব হতো না। অন্যভাবে বললে এর অস্তিত্বই থাকত না কোনো।

ব্রাউনিং এর “Fears and Scruples” কবিতাটি কাফকার লেখার ভবিষ্যদ্বাণী করে। কিন্তু কাফকা পড়ার অভিজ্ঞতা আমাদের কবিতাটার পাঠানুভূতিকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে, এনে দেয় তীব্রতা। ব্রাউনিং নিজে কখনোই কবিতাটিকে এমনভাবে পড়েনি যেভাবে আমরা এখন পড়ছি। সমালোচনার অভিধানে পূর্বসূরি শব্দটি অপরিহার্য কিন্তু একে সবধরনের বিতর্ক ও তুলনার উর্ধ্বে যেতে হবে।  প্রত্যেক লেখকই তার পূর্বসূরি নির্মাণ করে। তার কাজ যেমন অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টে দেয়, পাল্টে দেয় ভবিষ্যতকেউ।[২] এই পারস্পরিক সম্পর্কের সাথে জড়িত মানুষের স্বাতন্ত্র্য অথবা বহুত্ব খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্রাউনিং বা লর্ড ডানসানি (Lord Dunsany) কাফকার পূর্বসূরি হিসেবে যতটা প্রকট, ততটা প্রকট নয় বেট্রাখটুং (Betrachtung)-এর আদি কাফকা, লোকায়ত পুরাণ ও নির্মম আচারগুলো।

পাদটীকা

[১] পবিত্র এই প্রাণীটির অপরিচিতি এবং মানুষের হাতে এর নিন্দনীয় আর দুর্ঘটনাজনিত  মৃত্যু চিনা সাহিত্যের প্রচলিত বিষয়। ইয়ুং-এর (Carl Gustav Jung) Psychologie und Alchemie-এর শেষ অধ্যায় দ্রষ্টব্য। যাতে দুটি আগ্রহব্যাঞ্জক দৃষ্টান্ত রয়েছে।

[২] টিএস এলিয়টের points of wiew (১৯৪১), পৃ: ২৫-২৬ দ্রষ্টব্য

লেখাটি শেয়ার করুন