দেরিদার বিনির্মাণ

“অশিক্ষিত” লোকদের চিন্তা-পদ্ধতির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—তারা নিজেরা যা বোঝে, কেবল তাকেই সত্য মনে করে—একমাত্র সত্য। বাদবাকি সবাই ভুল কিংবা ভুলের কাছাকাছি। আর সেই সত্য প্রচারে সর্বদাই তাদের মারমুখো পর্যায়ে উপনীত হতে দেখা যায়। অবশ্য, একমাত্র সত্যের সাক্ষাৎ যারা পেয়ে যায়, সেই সত্য বিতরণে, পর্যায়ক্রমে মারমুখো হওয়া ছাড়া তাদের উপায়-ই বা কী? এই সমস্যা কেবল “অশিক্ষিত” লোকদেরই নয়, নামমাত্র “শিক্ষিত” লোকদের বেলায়ও তা সমানভাবে কিংবা আরও বেশি করে প্রযোজ্য। কারণ, কম আর বেশি তারা তাদের বোঝাপড়ার পক্ষে সাফাই গাইতে পারে। তবে, এই সংকটের দায় কিন্তু সেই শিক্ষিত কিংবা নামমাত্র শিক্ষিত লোকদের নয়। তাছাড়া, সংকটটিকে আপাত অর্থে যতো সরল-সোজা মনে হয়, তা মোটেই এতো সরল আর সোজা নয়। দেরিদা বলবেন, এই সংকট গোটা পশ্চিমা চিন্তা-পদ্ধতিরই সংকট; এই সংকট কাঠামোবদ্ধ চিন্তার সংকট। আর তিনি যখন এই কাঠামোবদ্ধ চিন্তার ভরকেন্দ্র ধরে নাড়া দেবেন, গোটা পশ্চিমা চিন্তা-পদ্ধতিই তখন ধড়মড় করে ভেঙে পড়বে।

ফরাসি তাত্ত্বিক লেভি-স্ত্রস, বার্থ, ফুকো ও লিওতারের মতো দেরিদাকেও জাপানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো। দেরিদা জাপান সফরও করেছেন তিন তিনবার: ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৯২ সালে। প্রসঙ্গক্রমে, তার এই জাপান সফর সম্পর্কে বলতে গিয়ে, জিম পাওয়েল লিখেছিলেন, আশির দশকের শেষদিকে দেরিদা জাপান এসেছিলেন আসাদা আকিরা ও কোজিন কারাতানিদের মতো দার্শনিকদের সঙ্গে আলাপ করতে, যারা গর্ব করে বলতেন যে জাপানের আসলে দেরিদার বিনির্মাণ দরকার নেই, কারণ জাপানেরই নিজস্ব বিনির্মাণ রয়েছে; আর জেন দর্শনই তাদের সেই নিজস্ব ধরনের বিনির্মাণ—যা তুলে ধরে এক শূন্যের দর্শন (“Deconstruction” 150)। দেরিদা যদিও তাদের সঙ্গে একমত হননি, পাওয়েল লিখেছেন, তার উত্তর ছিলো: জাপানের অনেক কিছুরই বিনির্মাণ তখনও বাকি (“Deconstruction” 152)।

ঘটনাটি উল্লেখ করার উদ্দেশ্য দুটি—এক, আমাদের এখানে যেকোনো বৈদেশি চিন্তা বা তত্ত্বকে প্রশ্নের মুখোমুখি করার রেওয়াজ নেই বললেই চলে, বরং প্রতিযোগিতাটা চলে কে কতো অক্ষতভাবে তাকে গ্রহণ ও উপস্থাপন করতে পারছে, তা নিয়ে। দেখা যায়, কোনো তত্ত্ব যদি আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক কিংবা মাপ মতো না হয়, পরামর্শ আসে সেই তত্ত্বের আলোকে নিজেদেরই বদলে নেওয়ার; কেননা, সেই বৈদেশি চিন্তাকে মনে করা হয় সর্বজনীন সত্যের প্রতিভূ, যা কেবল উদ্ধৃতি প্রদানের জন্য হলেও সদা সংরক্ষিত থাকা চাই—তাকে পর্যালোচনা কিংবা ঝাড়াই-বাছাইয়ের মতো শেরেকি কাজ করার সাহস আমাদের কোনোদিনই হয় না। ফলে, জাপানিদের মতো করে আমরা বলতে পারি না যে—তোমাদের তত্ত্ব আমাদের লাগবে না—এক্ষেত্রে আমাদের ভিন্ন কিছু চিন্তা আছে। দুই, অধ্যাপক ইজুৎসুর কাছে লেখা পত্রে দেরিদা বিনির্মাণ সম্পর্কিত তার কিছু খোলামেলা ভাবনা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান প্রবন্ধে যার উল্লেখ আমরা করবো। সেই দিক থেকে, জাপানি এক অধ্যাপককে লেখা পত্রের প্রেক্ষিতটাও পাঠকের কাছে পরিষ্কার থাকলো।

এখানে আরেকটা প্রসঙ্গ পরিষ্কার করা দরকার: পুরোটা আলোচনাই কিন্তু পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের ভেতরেই গড়ে ওঠবে; এমনকি দেরিদার চিন্তার যে সমালোচনা হাজির করা হবে, তা-ও পশ্চিমা জ্ঞানেরই অংশ। অর্থাৎ, সচেতনভাবেই বিনির্মাণকে এখানে অপরাপর চিন্তা-পদ্ধতির সঙ্গে, যেমন মাধ্যমিকদের শূন্যতার সঙ্গে কিংবা বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন তত্ত্বের সঙ্গে, সংশ্লিষ্ট করে আলোচনা করা হবে না। তার বদলে, পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের অংশ হিসেবেই তার চিন্তা কীভাবে সহায়ক হতে পারে, তা আলোচিত হবে। এমনকি দেরিদার জাপান সফরের অভিজ্ঞতাও তুলনামূলক আলোচনার অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে, বর্তমান প্রবন্ধটির লক্ষ্যই দেরিদার বিনির্মাণকে যথাসম্ভব সরলভাবে উপস্থাপন করা, আর তা কীভাবে আমাদের চিন্তায় ঘাপটি মেরে থাকা সংকটগুলোকে চিহ্নিতকরণ ও তা বর্জনে সহায়তা করতে পারে হতে, সেই রাস্তা খোঁজ করা; এছাড়াও সাহিত্য পঠন-পাঠনে বিনির্মাণকে কীভাবে পদ্ধতি হিসেবে প্রয়োগ করা যায়, সেই সূত্রও অন্বেষণ করা।

সংযোগ

কোনো চিন্তাই পরম্পরা বর্জিত নয়। দেরিদারও ঠিকুজি আছে। বলা হয়, দেরিদা যদি পশ্চিমা চিন্তাকে তার মাথার ওপর দাঁড় করিয়ে থাকেন তাহলে তিনি তা পেরেছিলেন কয়েকজন চিন্তকের হাত ধরেই। তারা আর কেউ নন: নিটশে, ফ্রয়েড, হাইডেগার আর সসিউর। নিটশের কাছ থেকে দেরিদা পেয়েছেন দর্শন বিষয়ক, সত্যের দাবি সম্পর্কে, গড়পড়তা এক সন্দেহবাদ—বিশেষত এর পদ্ধতি। কেননা, তার মতো দেরিদাও মনে করতেন আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কয়েদি। যে-কারণে, কারও দৃষ্টিভঙ্গি উল্টানোর ক্ষেত্রে তারা দুজনেই নাশকতামূলক অনুশীলনের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। উভয়েই তারা উল্টে (আর পাল্টে) দিয়েছেন বিষয়ী/ বিষয়; সত্য/ মিথ্যা; নৈতিক/ অনৈতিকের মতো নানা বৈপরীত্য জোড়। উভয়েই তারা, নিটশে আর দেরিদা, এমন কৌশলে লেখেন যা জ্ঞানক্ষেত্রে চিন্তার নাচনকে উস্কে দেয়: সে এমন নাচন, যা লীলাময়, পরম নিশ্চয়তা আর পরম সন্দেহের মধ্যে পাঁক খায়। “ঈশ্বর মৃত” তার এই বিবৃতি এবং খ্রিস্টানধর্ম ও পশ্চিমা আধিবিদ্যক পরম্পরাকে আক্রমণের মধ্য দিয়ে নিটশে পশ্চিমা চিন্তার ভরকেন্দ্রটিকেই ধ্বংস করে দেন, সৃষ্টি করেন এক-ধরনের ধর্মীয় শূন্যতা (Powell “Derrida” 13-14)। দেরিদাকে তারই উত্তরসূরি রূপে সহজেই চেনা যায়।

পশ্চিমারা অবশ্য বেশিদিন এই শূন্যতা বরদাশত করলেন না, পাওয়েল খুব মজা করেই লিখেছেন, ঐতিহ্যগতভাবেই দেয়ালের এক গর্তের কাছে গিয়ে ভক্তি গদগদ সুরে কেউ বলে না, “হে পবিত্র গর্ত!” তাওবাদী আর বৌদ্ধরা অবশ্য আলাদা। ফলে, আমরা এমন এক জগতের বাসিন্দা আর উত্তরাধিকার, যেখানে অনুপস্থিতির ওপর উপস্থিতির—অদৃশ্যর ওপরে মূর্তির—গর্তের ওপরে সম্পূর্ণের প্রাধিকার। অর্থাৎ, কোনো ফাঁকা জায়গাকে কিছু-না-কিছু দিয়ে ভরাট করে ফেলাই আামাদের স্বভাব। আমরা যেমন বস্তুর—দাড়িম্ব ও ফুলের তোড়া—স্বাদ, সুরত, গন্ধ ও প্রকাশ আস্বাদন করি, তেমনই নির্বস্তুসমূহকেও কামনা করি বস্তুরূপে। আমাদের ভাষা পরিণত হয় রক্তমাংসে, আমাদের বিষ্ণু সুখকরভাবে রূপায়িত হয় কৃষ্ণ ও তার সহস্র সখীতে, আমাদের ভিনেগ্রাত্তি হাওয়া থেকেই পয়দা হয়। এভাবে আমরা নানাভাবেই এই শূন্যতাকে ভরাট করার চেষ্টা করি, চেষ্টা করি এক নতুন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার: আধুনিক শিল্প দিয়ে, পুরাণ দিয়ে, সঙ্গীত দিয়ে, কবিতা দিয়ে, স্বপ্নলব্ধ আদিরূপ দিয়ে, হরে কৃষ্ণ জপার মাধ্যমে কিংবা কাহুনাকে পূজা করার মাধ্যমে, বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা দিয়ে, গঠনবাদ দিয়ে। কিন্তু দেরিদা আর অধিকাংশ উত্তরাধুনিকেরা বলবেন: বিকেন্দ্রীকৃত হওয়াটাই যথার্থ, এমনকি তা সময়েরও দাবি (“Derrida” 15)।

সসিউর দেখলেন যে দাবার নিয়ম যেমন বোর্ডে ঘুঁটিগুলোর চলন নির্দিষ্ট করে দেয়, তেমনি সকল ভাষার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট রূপায়নের নেপথ্যে কাজ করে এক অদৃশ্য গঠন। একইরকমভাবে, সাংগঠনিক নৃবিজ্ঞানীরাও মনে করেন পুরাণ ও আত্মীয়তার মতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক রূপের নেপথ্যেও এক-ধরনের অদৃশ্য গঠন কাজ করে। এভাবে বস্ত্রাপসারণ, মুষ্টিযুদ্ধ, পুরাণ, রাজনৈতিক প্রচারণা, ধর্মীয় আচার ও এমনকি ট্রাফিক সিগনালের মতো বিভিন্ন পাঠ্যেরও সাংগঠনিক বিশ্লেষণ শুরু হয়। এই ধরনের বিশ্লেষণে উপাদানসমূহের অর্থের চেয়ে উপাদানসমূহের মধ্যেকার সম্পর্কটাই অধিকতর গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। যেমন, ট্রাফিক সিগনালের ক্ষেত্রে লাল, হলুদ ও সবুজ বাতির অর্থ তাদের সবুজ কিংবা হলুদের ওপর নির্ভর করে না; সেখানে বাতিগুলোর অর্থ তৈরি হয় গোটা সিস্টেমের সাপেক্ষে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে; রঙগুলোকে অন্য কোনো রং দিয়ে বদলে দিলেও সম্পূর্ণ সিস্টেমের অর্থ একই থাকবে। একটি পার্পল বাতি যথারীতি নির্দেশ করতে পারে—থামো (Powell “Derrida” 17-8)! সসিউরের প্রভাব দেরিদার চিন্তায় বিপ্রতীপ কায়দায় ধরা পড়ে। তার চিন্তার সূত্র ধরেই দেরিদা কাঠামোবদ্ধ গোটা পশ্চিমা চিন্তা-পদ্ধতিরই বিনির্মাণে শামিল হন।

তেমনই deconstruction-এর ধারণাটি দেরিদা পেয়েছেন জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের destruktion-এর ধারণা থেকে। হাইডেগার এর দ্বারা অন্তর্গত বিকাশ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে সত্তাতত্ত্বের পুরোনো ঐতিহ্য—বাস্তবতার চূড়ান্ত স্তরের অধ্যয়ন করতে গিয়ে—আলগা করে দিতে চান। দেরিদা তার পত্রে নিজেই এই কথা বলবেন। এ-নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো। কোনো একটি অভিধা লেখার পর তা কেটে দেওয়ার অভ্যাসটিও দেরিদা তার কাছ থেকেই রপ্ত করেছেন। হাইডেগার যেমন কোনো অস্তিমানকে (অস্তিমান) চলকরূপে পেশ করার জন্য “×” চিহ্নিত করে দেন, সেই পদাঙ্ক দেরিদা অনুসরণ করেন ‘অস্তি’র (is) ক্ষেত্রে। যেমন, চিহ্নবিদ্যার জায়গা থেকে কফিশপের খদ্দেররা যখন প্রশ্ন তোলে এই টেবিলটা কি আসলেই একটা টেবিল (is)? একইভাবে, সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে সঙ্গে নিয়ে মানবচৈতন্যের অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দেরিদা। কারণ, তিনি দেখলেন শুদ্ধ উপলব্ধি বলে আদতে কিছু নেই; কেননা, সকল উপলব্ধি আগে থেকেই অতীত অভিজ্ঞতা দ্বারা জারিত থাকে। এটি অতীতাভিজ্ঞতার অচেতন আছড় দ্বারা সর্বদাই তাড়িত অবস্থায় নিজ থেকে আলাদা হতে থাকে। সর্বদা এটি পার্থক্যের ভিত্তিতেই চিহ্নিত হয়ে থাকে (Powell 16)। বিনির্মাণের ক্ষেত্রে দেরিদাকে দেখা যায় কমপক্ষে যাদের দ্বিগুণ অর্থ রয়েছে এমন শব্দসমূহের দ্ব্যর্থবোধকতার ওপর, তাদের অবাধ লীলার ওপর নির্ভর করতে। এ-রকম একগুচ্ছ লীলাময় শব্দকে তিনি কাজে লাগান:

ফার্মাকন বিষ/প্রতিষেধক (প্লেটো পড়ার ক্ষেত্রে)

সতীচ্ছদ কুমারীত্ব/ভোগ; অন্দর/বাহির (মালার্মে পড়ার ক্ষেত্রে)

বদলি উদ্বৃত্ত/প্রয়োজনীয় সংযোজন (রুশো পড়ার ক্ষেত্রে) (Powell “Derrida” 116)

বিনির্মাণ

এটা তো আর বলার দরকার নেই যে deconstruction-এরই আমরা বাংলা করছি বিনির্মাণ। ডিকনস্ট্রাকশন বললে বাংলায় এখন যেমন সবাই বিনির্মাণই বোঝে, ব্যাপারটা কিন্তু সবসময় এমন ছিলো না। দার্শনিক বিমলকৃষ্ণ মতিলাল এর বাংলা করতে চেয়েছেন “অবিসংযোগ—ন্যায়বৈশেষিক থেকে তৎসম শব্দে”। ফরাসি থেকে দেরিদার Of Grammatology-বইটার ইংরেজি তর্জমাকারী গায়ত্রী স্পিভাক ডিকনস্ট্রাকশন নিয়ে তার একটি লেখা শুরুই করেছেন বিমলকৃষ্ণের কথা দিয়ে। তবে “অবিসংযোগ” শব্দটিকে স্পিভাক গ্রহণ করেননি—কেন করেননি, তার যুক্তিও দিয়েছেন। ঠিক করেন অবিনির্মাণ কথাটাই রেখে দিবেন। লিখেছেন, “গোড়ায় ‘বিনির্মাণ’ মনে লেগেছিল। ডিকন্স্ট্রাক্শন যে ‘বিশেষরূপে নির্মাণ’ এটা অনেকে ধরতে পারে না… ডিকনস্ট্রাকশন তো শুধু বিশেষরূপে নির্মাণ নয়, বিশেষরূপে অনির্মাণও বটে” (স্পিভাক ২৩)। কেন অবিনির্মাণটাই রেখে দিলেন, কমবেশি সেই কথাও জানিয়েছেন। আমরা ইচ্ছা করেই সেই দিকে আলাপ লম্বা করবো না।

এখন কথা হলো আমরা কেন “বিনির্মাণ” শব্দটিকেই বেছে নিলাম। কিছু কথা তো বলতেই হয়। বিনির্মাণ কথাটা মনে ধরলেও স্পিভাক তা গ্রহণ করেননি, তার কারণ সম্ভবত “বি” উপসর্গের নেতিবাচক অর্থ নিয়ে ধরা পড়া। অর্থাৎ, নির্মাণের সঙ্গে এটি কেবল বিরোধী ভাবে যুক্ত নয়, তাই হয়তো মনে করিয়ে দিয়েছেন যে এটা ‘বিশেষরূপে নির্মাণ’ও। যাইহোক, আমরা অন্যদিক থেকে এগোবো। আমরা “বি” উপসর্গেরই ভাবগত অর্থবৈচিত্র্যের দিকে মনোযোগ দিবো, যেখানে ভাবের দিক থেকে উপসর্গটি শব্দভেদে প্রায় ডজন খানেক অর্থ প্রদান করে: ১। পৃথকভাব (বিয়োগ, বিশ্লেষ); ২। বিবিধ ভাব (বিচিত্র, বিবিধ); ৩। অতিশয় ভাব (বিকীর্ণ); ৪। মোহ ভাব (বিমনস্ক, বিমুগ্ধ); ৬। বৈপরীত্য ভাব: (বিকর্ম, বিক্রয়, বিকল্প); ৭। বিরোধী ভাব (বিবাদ, বিজাতীয়); ৮। বিশেষ ভাব (বিকচ, বিকর্তন, বিবেচ্য, বিরচন, বিভূষণ, বিনীত, বিশিষ্ট); ৯। অভাব (বিধবা, বিস্মৃতি); ১০। বিকৃতি বা বৈরূপ্য ভাব (বিকট, বিকার, বিকৃত); ১১। বিস্তারিত ভাব (বিকথন, বিস্তীর্ণ) (Onushilon)। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো বিনির্মাণের “বি” উপসর্গটি একইসঙ্গে কমবেশি পৃথক ভাব, বৈপরীত্য ভাব, বিরোধী ভাব, বিশেষ ভাব ও বিস্তারিত ভাব সবগুলোকেই প্রকাশ করে। এই দ্ব্যর্থকতা কিংবা বহু অর্থকতা দেরিদার পছন্দ। বিনির্মাণের মতো অন্যান্য যে সকল শব্দ তিনি ব্যবহার করেন—যেমন “ecriture”, “trace”, “difference”, “supplement”, “hymen”, “pharmakon”, “marge”, “entame”, “parergon”—তাদের দ্ব্যর্থকতার ওপরই তাকে জোর দিতে দেখা যায় (“Letter” 5)। ফলে, তার “ডিকনস্ট্রাকশন”কে ধরতে “বিনির্মাণ” শব্দটাকেই আমাদের জুৎসই মনে হয়। তবে আমরা আরও তলিয়ে দেখার পক্ষপাতী যে দেরিদার কাছে ডিকনস্ট্রাকশন কীভাবে ধরা দেয়।

দেরিদা যখন শব্দটা বেছে নেয় বা, বলা ভালো, শব্দটা যখন তার গায়ের ওপর এসে পড়ে, তিনি আসলে মোটেও ভাবেন নাই যে, এই শব্দটাই একদিন তার প্রায় সকল আলাপের ভার নেওয়া শুরু করবে। শব্দটি তিনি প্রথম ব্যবহার করেন তার ব্যাকরণ নিয়ে বইটাতে। তার দিক থেকে তিনি চাইছিলেন এর দ্বারা হাইডেগারীয় শব্দ Destruktion কিংবা Abbauকে ধরতে কিংবা বাগে আনতে। দুটোই এক্ষেত্রে কাঠামো কিংবা সত্তাতত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহের প্রথাগত কাঠামো কিংবা পশ্চিমা অধিবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্রিয়াপদ্ধতি বোঝায়। কিন্তু “destruction” ফরাসিতে স্পষ্টভাবে ধ্বংস কিংবা নেতিবাচক সংকোচন বোঝায় যা হাইডেগারীয় ব্যাখ্যা কিংবা দেরিদার অভীষ্ট অর্থের চেয়ে নিটশীয় “বিনাশ”-এর কাছাকাছি। যে-কারণে, শব্দটা তিনি বাদ দেন। তারপর এক-রকম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই deconstruction শব্দটি নিয়ে ভাবতে থাকেন। শব্দটি তিনি এমিল লিট্রের Dictionary of the French language (The Littré)-তে পেয়েছেন। তিনি দেখলেন ব্যাকরণিক, ভাষাতাত্ত্বিক, কিংবা আলঙ্কারিক অর্থের সঙ্গে এখানে কারিগরি অর্থটাও যুক্ত হয়ে আছে। সমন্বয়টাকে সৌভাগ্য বলেই মনে হয়, আর ভাগ্যবলে দেরিদাও যেন ঠিক এমন কিছুই বোঝাতে চাচ্ছিলেন (Derrida “Letter” 1-2)।

অধ্যাপক ইজুৎসুকে লেখা চিঠিতে লিট্রের ভুক্তি থেকে দেরিদা কয়েকটা উদ্ধৃতিও দিয়েছেন। Deconstruction সেখানে “Action of deconstructing. Grammatical term. Disarranging the construction of words in a sentence”। লেমারের লাতিন ভাষার কোর্স-এর, সতেরো নম্বর অধ্যায়, “কীভাবে ভাষা শিখতে হয়”তে “Of deconstruction” হলো: “Common way of saying construction”। লিট্রের ভুক্তিতে deconstruire অর্থাৎ “deconstruct” হলো: এক, “To disassemble the parts of a whole. To deconstruct a machine to transport it elsewhere”; দুই, “Grammatical term… To deconstruct verse, rendering it, by the suppression of meter, similar to prose. Absolutely”; লেমারে লিখেছেন “In the system of prenotional sentences, one also starts with translation and one of its advantages is never needing to deconstruct”; তিন, Se deconstruire অর্থাৎ, “to deconstruct itself” নির্দেশ করে: “to lose its construction”; The Dictionaire de l’Academie-এর মুখবন্ধে ভিলমেইন যেমন লেখেন: “Modern scholarship has shown us that in a region of the timeless East, a language reaching its own state of perfection is deconstructed [s’est deconstruite] and altered from within itself according to the single law of change, natural to the human mind” (Derrida “Letter” 2)।

ডিকনস্ট্রাকশনকে অনুবাদে ধরার জটিলতা তো আছেই। দেরিদাই বলেন যে, এটা মনে করার কোনো কারণই নেই যে, ফরাসি ভাষায় “ডিকনস্ট্রাকশন” শব্দের কোনো পরিষ্কার ও একক অর্থ আছে (“Letter” 1)। তিনি লেখেন, এটা অবশ্যই বলা দরকার, ফ্রান্সে এটি বিরল-ব্যবহৃত ও অপরিচিত শব্দই ছিলো। ব্যাকরণ নিয়ে বইটাতে যে আলাপ পাড়া হয় সেই প্রেক্ষিতে একে পুনর্নির্মাণ করে নিতে হয়েছে (“Letter” 2)। আসলে বিনির্মাণ নিয়ে কেউ সারাদিন কথা বলতে পারে। কিন্তু, বিনির্মাণ কী জিনিস?—এই ধরনের প্রশ্নের কোনো জবাব আসলে সম্ভব নয়। কারণ, সেই প্রশ্নের যে জবাবই ধার্য হোক না কেন, তা আর যা-ই হোক, বিনির্মাণ নয়। দেরিদা লেখেন,

All sentences of the type “deconstruction is X” or “deconstruction is not X” a priori miss the point, which is to say that they are at least false. As you know, one of the principal things at stake in what is called in my texts “deconstruction” is precisely the delimiting of ontology and above all of the third person present indicative: S is P. (Derrida “Letter” 4)

যে-কারণে, বিনির্মাণ-এর সংজ্ঞায়ন করতে চাওয়াটা আসলে দেরিদার চিন্তারই পরিপন্থী। বিনির্মাণ প্রশ্ন তার কাছে আগাগোড়া তর্জমা, ধারণার ভাষা ও তথাকথিত “পশ্চিমা” অধিবিদ্যার ধারণাসংগ্রহের প্রশ্নও (“Letter” 1)। অধ্যাপক ইজুৎসুকে লেখা পত্রে, বলা যায়, ডিকনস্ট্রাকশন নিয়ে তিনি বিস্তারিতই লিখেছেন। মজার ব্যাপার হলো, যতোই তিনি আলাপের বিস্তার ঘটিয়েছেন, তার দ্ব্যর্থবোধকতা ততোই যেন বেড়েছে। শেষমেষ এমন কথা যেন দেরিদার কলমেই মানায়:

What deconstruction is not? everything of course!

What is deconstruction? nothing of course! (Derrida “Letter” 5)

কেন্দ্র

বিনির্মাণ, কেন্দ্রসমূহের সমস্যাসংকুল চরিত্র উন্মোচনপূর্বক, বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পঠন-পাঠনের ধরন। বিকেন্দ্রীকরণ, কেন্দ্রসমূহ, কেন্দ্র—এগুলা কী? কেন্দ্র একটা হলে সমস্যা কোথায়? কারও জন্যে বিকেন্দ্রীকৃত হওয়া কেন দরকার? আসলে দেরিদা যখন নিৎশে কিংবা হাইডেগারদের মতো সূ² দার্শনিকদের কোনো পাঠ্যকে বিনির্মাণ না-করেন, তার লেখায় তখন বিমূর্ত ভাষায় কেন্দ্র সম্পর্কে আলাপ থাকে। তার মতে, পশ্চিমা চিন্তা মাত্রই কোনো এক কেন্দ্রের ধারণার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকে। এই যেমন কোনো উৎস (Origin), কোনো সত্য (Truth), আদর্শ কোনো রূপ (Ideal Form), কিংবা কোনো স্থির বিন্দু (Fixed Point), কোনো স্থির চালকশক্তি (Immovable Mover), বা কোনো নির্যাস (Essence), কোনো ভগবান (God), কোনো উপস্থিতি (Presence)। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা বড়ো অক্ষরে নির্দেশিত হয়ে থাকে ও সকল রকমের অর্থেরই নিশ্চয়তা দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০০ বছরের পশ্চিমা চিন্তার অধিকাংশই খ্রিস্ট ও খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো। অন্যান্য সংস্কৃতিসমূহের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব কেন্দ্রীয় প্রতীক (Powell “Derrida” 21-2)।

দেরিদা বলছেন, কেন্দ্রের সমস্যা হলো তা বর্জনমুখী। অর্থাৎ, তা কেবল প্রত্যাখ্যান করতে চায়। আর এটা করতে গিয়ে সর্বদাই তা অপরকে উপেক্ষা ও অবদমন করে কিংবা (যা ‘অপর’ হয়ে ওঠে) তার প্রান্তীয়করণ ঘটায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেমন, পুরুষ থাকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় (আর নারী সেখানে প্রান্তীয়, অপর, অবদমিত, উপেক্ষিত, কিনারায় ঠেলে দেওয়া)। তেমনই কোনো সংস্কৃতি—প্রতিমা হিসেবে—যার কেন্দ্রে আছে খ্রিস্ট, সেই সমাজে খ্রিস্টানরাই প্রাধান্য পাবে; থাকবে কেন্দ্রে; আর বৌদ্ধ, মুসলমান ও ইহুদিরা—যারাই আলাদা—ঠাঁই পাবে প্রান্তে; একদম পরিধিস্থ—বাইরের দিকে ঠেলা খাওয়া। ঠিক যে-রকম পরিস্থিতিতে দেরিদা বেড়ে ওঠেছেন, আলজেরিয়ার আত্তীকৃত এক ইহুদি পরিবারে, পরিধিস্থ ও অধিকারচ্যুত সমাজের একজন সদস্য হিসেবে (Powell “Derrida” 23)।

অর্থাৎ কোনো এক কেন্দ্রের প্রতি তাড়না এক-ধরনের যুগল বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। কেননা কেন্দ্র তার বিপরীত প্রত্যয়রূপে গড়ে তোলে প্রান্ত। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, কেন্দ্র এই যুগল বৈপরীত্যের মধ্যে জারি থাকা প্রতিযোগিতাটিকেও নির্ধারণ ও স্থিরতা দিতে চায়। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, যুগল বৈপরীত্যের মধ্যেকার এই প্রতিযোগিতাটি আসলে কী নির্দেশ করে? এর নির্ধারণ বলতেই বা কী বোঝায়? আসলে নারী/পুরুষ যুগল বৈপরীত্যের মতো আরও অসংখ্য যুগল বৈপরীত্য রয়েছে। যেমন, আত্মা/বস্তু; প্রকৃতি/সংস্কৃতি; ককেসীয়/কৃষ্ণাঙ্গ; খ্রিস্টান/পেগান। দেরিদা বলছেন, বিভিন্ন ধারণা, সংকেত কিংবা বর্গের মধ্যস্থতা ছাড়া মানুষ আসলে বাস্তবকে ব্যাখ্যা করায় অপারগ। কারণ মানুষের ভাবনা কাজই করে এই সকল ধারণাগত জোড় নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে। আর এই বিপরীত যুগলের মধ্যেকার একটি সর্বদাই অপরটির চেয়ে অগ্রাধিকার পায়। উপরের উদাহরণগুলোর ক্ষেত্রে যেমন বাম পাশের প্রত্যয়সমূহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। ফলে ডান পাশের প্রত্যয়গুলো স্বাভাবিকভাবেই হয়ে পড়েছে প্রান্তীয়। খ্রিস্ট অথবা বুদ্ধ কিংবা কেন্দ্রস্থিত যেকোনো প্রতিমাই আসলে কেন্দ্রীয় বাস্তবতাটিকেই একমাত্র বলে পেশ করতে চায়। অপরাপর মতগুলো থাকে অবদমিত। এই ধরনের কোনো প্রতিমা চিত্রণ করার অর্থই বৈপরীত্য যুগলের মধ্যেকার প্রতিযোগিতাটাকে থামিয়ে দেওয়া। যেমন খ্রিস্টান/ইহুদি কিংবা খ্রিস্টান/পেগান। এমনকি সেই আলাপে হয়তো ইহুদি ও পেগানদের প্রসঙ্গই আসবে না। কিন্তু প্রতিমাগুলো তো সামাজিক কার্যাবলির একটি মাত্র বৈপরীত্য যুগলের মধ্যেকার প্রতিযোগিতায় স্থিরতা এনে দেয়। এরকম উদাহরণের অবশ্য অভাব নেই। যেমন বিজ্ঞাপনের কাজ, সামাজিক সংকেত, নিষেধ, প্রথা, বর্গ ও আচারসমূহ। এগুলোও ঠিক একই কাজ করে। কিন্তু ভাষা ও বাস্তবতা প্রতিমাগুলোর মতো মোটেও এতো সরল ও একক নয় যে: একটি কেন্দ্রীয় চিত্র থাকবে, আর তা কেন্দ্রীয় হওয়ার কারণেই বাদবাকি চিত্রসমূহের ঠাঁই হবে প্রান্তে; ফলে থাকবে কেবল কেন্দ্র, আর থাকবে বর্জনযোগ্য প্রান্ত। ভাষা ও বাস্তবতার রূপগুলো বরং অনেক বেশি অনিশ্চিৎ (Powell “Derrida” 24)।

চিত্র ১: [চিত্রটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত]
চিত্র ১: [চিত্রটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত]

উপরের চিত্রটার মজার দিকটা হলো আপাত দৃষ্টিতে এর একটাই সম্ভাবনা চোখে পড়ে। মুহূর্তের জন্য চিত্রটা ফুটিয়ে তুলে দুটো মুখচ্ছবি। এবং ঐ মুহূর্তের জন্য সেই সম্ভাবনাটাই ‘কেন্দ্রীয়’। কিন্তু কাঠামোটিতে যেহেতু সম্ভাবনাসমূহের মধ্যেকার প্রতিযোগিতাটা নির্ধারিত নয় সেহেতু পরের মুহূর্তেই অপর দৃশ্যটিও ফুটে ওঠে। দেখা যায় ফুলদানি সদৃশ একটি অবয়ব। নিচের ছবিটাও অনুরূপ চিত্রই ফুটিয়ে তোলে। এক মুহূর্তে সেটি এক স্যাক্সোফোন বাদককে নির্দেশ করলেও পরমুহূতেই তা সূচিত করে এক তরুণীর মুখচ্ছবি (Powell “Derrida” 25)।

চিত্র ২: [চিত্রটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত]
চিত্র ২: [চিত্রটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত]

ধরা যাক, একটি দল ক্ষমতা দখল করে নিল, যাদের নাম Face-ist—মানে মুখচ্ছবিবাদী। এই নামটি জিম পাওয়েল আসলে ইচ্ছা করেই নিয়েছেন যাতে ঠিক ‘ফ্যাসিস্ট’-এর মতো শোনায়। তো তারা কেবল মুখচ্ছবিটাই দেখবে। আর এই প্রয়াসটাই দৃশ্যগত সম্ভাবনাগুলোর মধ্যেকার অবাধ প্রতিযোগিতাটিকে স্থির করে দেবে। এটি অর্থগত পার্থক্যসমূহের মধ্যেকার প্রতিযোগিতাটারও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবে তো ছবিগুলো মুখচ্ছবি ও ফুলদানি কিংবা মুখচ্ছবি ও স্যাক্সোফোন বাদক উভয়কেই দেখায়। এসব ক্ষেত্রে Vase-ist কিংবা Muse-istরা প্রান্তীয়, অবদমিত এমনকি শোষিত কিংবা নিপীড়িত। ছবিতে ফুটে ওঠা মুখের আদল হয়ে ওঠে যুগল কাঠামোর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত সদস্য। অন্যভাবে বললে, গড়ে ওঠে এমন এক-ধরনের আগ্রাসী কর্তৃত্বক্রম যেখানে জোড়ার কেন্দ্রীয় সদস্যটি, মানে মুখচ্ছবি, বাস্তব আর সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। দেরিদার দাবি, পশ্চিমা চিন্তার ধরনটাই আসলে এমন। সেখানে যুগল বৈপরীত্য গঠনপূর্বক সেই যুগলের একটি সদস্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে কাঠামোর মধ্যেকার প্রতিযোগিতাটি নির্ধারিত হয়ে জোড়ার অপর সদস্যটিকে স্বভাবতই প্রান্তীয় করে তোলে (Powell “Derrida” 25)।

সাহিত্য

ইতোমধ্যে এটা বোঝা গেছে যে, বিনির্মাণ বিকেন্দ্রীকরণের পদ্ধতি; পঠন-পাঠনের ধরন, যা প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় প্রত্যয়টির কেন্দ্রিকতা সম্পর্কে পাঠককে সতর্ক করে। তারপর তা কেন্দ্রীয় প্রত্যয়টির আধিপত্য নষ্ট করতে তৎপর হয় যাতে প্রান্তীয় প্রত্যয়টি কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠতে পারে। প্রান্তীয় প্রত্যয়টি তখন কিছু সময়ের জন্য কর্তৃত্বক্রমটিকে ছুড়েও ফেলে। এখন দেখার বিষয় ভাষা ও সাহিত্যের বেলায় এটি কীভাবে কাজ করে! নিচের হাইকুটা নিয়ে আলাপ করা যাক:

How mournfully the wind of
autumn pines
upon the mountainside as day
declines. (Powell “Derrida” 26)

এখন ধরা যাক, হাজার বছর ধরে কবিতাটা পড়ার বিশুদ্ধ রীতি ছিলো “pine” শব্দটাকে ক্রিয়া হিসেবে পড়ার। অর্থাৎ কারও হারানো প্রেমের জন্য আকুল প্রতীক্ষা। অন্য অর্থটা তাহলে কেমন! দ্বিতীয় চরণের ক্ষেত্রে “pines” শব্দটা বিশেষ্যরূপে এরকম বদলে যেতে পারে: “Pines upon the mountainside”। সাহিত্যের কোনো একটি অংশকে বিনির্মাণ করার ক্ষেত্রে এটি হবে দ্বিতীয় ধাপ। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রত্যয়টিকে উৎখাত করার জন্য এটি দেখাবে যে অবদমিত ও পরিধিস্থ অর্থও কী করে একইরকমভাবে কেন্দ্রীয় হতে পারে। বিষয়টা তাহলে দাঁড়াচ্ছে কী? এর গুরত্বই বা কোথায়? এ তো নতুন আরেক কেন্দ্রই স্থাপন করছে! ক্রিয়ারূপের পরিবর্তে আসছে বিশেষ্যরূপ। বা বলা যায় ফেইসইস্টের বদলে ক্ষমতায় বসছে ভেইসইস্ট। আসলেই তাই। দেরিদা বলছেন, বিনির্মাণ একটা রাজনৈতিক চর্চা। ফলে, কারও জন্য চট জলদি এই উৎখাত পর্বটিকে উপেক্ষা কিংবা নিষ্ক্রিয় করা একদম অনুচিত হবে। অদলবদলের এই পর্বটির দরকারই আসলে দ্বিতীয় প্রত্যয়টির ওপর প্রথম প্রত্যয়টির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বক্রমটাকে নষ্ট করার জন্য। সুতরাং শেষমেষ এই-ই দাঁড়ায় যে, নতুন এই কর্তৃত্বক্রমটিও একইরকমভাবে নড়বড়ে হবে। যে-কারণে যুগল বৈপরীত্যের অবাধ প্রতিযোগিতার কাছে তা অ-কর্তৃত্বক্রমিকভাবে সমর্পিত হয়। তখন দেয়া যায় উভয় রকম পাঠই কিংবা অন্যান্যগুলোও সমানভাবে সম্ভব হয়ে ওঠে। “Mountain side” বদলে যেতে পারে “Pines upon the mountain sighed” (Powell “Derrida” 26-28)।

অর্থাৎ সম্ভাবনাসমূহ দৃশ্যমান হয়ে ওঠছে। এখন পাঠ্যটি যদি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো বা তওরাত কিংবা বাইবেল বা রাষ্ট্রীয় সংবিধান হতো, তাহলেও কেউ এর নির্ধারিত, কর্তৃপক্ষীয়, বিশ্বাসনির্ভর ও গোঁড়া পাঠটির বিনির্মাণ করতে পারতো। নিঃসন্দেহে এই ধরনের পাঠ্যসমূহ উপরের হাইকু থেকে জটিল। তারা বহুকৌণিক। অনেকটাই যে নিচের এই ছবিটার মতো (Powell “Derrida” 29)।

চিত্র ৩: [চিত্রটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত]
চিত্র ৩: [চিত্রটি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত]

এরকম একটি ত্রিভুজ কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায় একটার পর আরেকটা আকার সহজেই দৃষ্টিতে ধরা পড়ছে। এবং বর্তমানে হাজির থাকা আকারটি পরের আকারটিতে চোখ পড়া মাত্রই তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আর অন্তহীন এই খেলা চলতেই থাকে। এখানে কোনো কেন্দ্রীয় আকার থাকে না, যা আকারসমূহের মধ্যেকার প্রতিযোগিতাটাকে স্থিরতা দেবে, বা কোনো পরিধিস্থ, অবদমিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত আকার। দেরিদার মতে, বিনির্মাণ করা হলে সব ধরনের ভাষা ও পাঠ্যের ক্ষেত্রেও ঠিক একই বিষয় ঘটে। মানুষের চিন্তাও যেহেতু ভাষা দিয়েই গঠিত সেক্ষেত্রেও তাই হয়। তার কথা হলো, সব ধরনের ভাষা ও পাঠ্যের ক্ষেত্রেই পাঠককে প্রতিনিয়ত অর্থগত সম্ভাবনার এই অবাধ প্রতিযোগিতাটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করতে হবে। নয়তো তা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, কেন্দ্রীকরণ, স্থিরতা ও এককেন্দ্রিকতার দিকে ধাবিত হবে। দুশ্চিন্তামুক্ত হওয়ার জন্য লোকে সর্বদাই নতুন কেন্দ্র নির্মাণ ও তার সঙ্গে যুক্ত থাকার, আর সেই কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ থেকে স্বতন্ত্রদের পরিধিস্থ করে তোলার তাগিদ বোধ করে (Powell “Derrida” 29)।

তাহলে বিনির্মাণ প্রক্রিয়া প্রথমত একটি পাঠ্যের মধ্যেকার যুগল বৈপরীত্যসমূহে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। যেমন, নারী/পুরুষ। পরে এটি দেখায় যে কীভাবে তারা পরস্পর সম্পর্কিত। অর্থাৎ, কীভাবে এর একটি কেন্দ্রীয়, স্বাভাবিক ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, আর অপরটি উপেক্ষিত, অবদমিত ও পরিধিস্থ। তারপর অল্প সময়ের জন্য এটি পাঠ্যটির কর্তৃত্বক্রমটাকে নষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত পাঠটির বিপরীত পাঠটিকেও সম্ভব করে তোলে। ফলে, শেষ পর্যায়ে দেখা যায় জোড়াটার উভয় প্রত্যয়ই অ-কর্তৃত্বক্রমিক ও অস্থির অর্থের এক অবাধ দোলায় দুলছে। দেরিদার ভাষায়—নৃত্য। এখন সহজেই মেলানো যাবে দেরিদার বক্তৃতা “Structure, Sign and Play in the Discourse of the Human Sciences” কেন এ-রকম মোচড় দিয়েছিলো। এই বক্তৃতায় তিনি দেখালেন যে, পশ্চিমা চিন্তা কী করে প্লেটোর আমল থেকেই, এমনকি সমসাময়িক ফরাসি কাঠামোগত নৃবিজ্ঞানী ক্লদ লেভি-স্ত্রসদের মতো বিজ্ঞানীদের কাজগুলোকেও কেমন একটি কেন্দ্রের জন্য ব্যাকুল করে তুলেছিলো। তার মতে, লেভি-স্ত্রসের জন্য এটি বরং সংকট তৈরি করেছিলো। সর্বোপরি, কাঠামোবাদীরা এই চিন্তাই করে যে, সবকিছুরই অন্তর্নিহিত কাঠামো আছে। প্রত্যেক ভাষার যেমন আছে নিজস্ব একটি কাঠামো: তার ব্যাকরণ। ইংরেজি ভাষায় বিশেষণকে বিশেষ্যের আগে বসাতে হয়। যেমন, Big red apple। ফরাসি ভাষার ক্ষেত্রে আবার ব্যতিক্রম। বিশেষণকে সেখানে জায়গা দেওয়া হয় বিশেষ্যের পর। যেমন, La pomme grosse et rounge। এই নিয়মে রচিত হতে পারে অসংখ্য বাক্য। লেভি-স্ত্রস মনে করতেন, পুরাণের ক্ষেত্রেও ঠিক একইরকম কাঠামো আছে। তার The Raw and the Cooked গ্রন্থে, বিখ্যাত এই নৃবিজ্ঞানী সকল বরোরো পুরাণের ব্যাকরণই লিখতে আরম্ভ করেছিলেন। কিন্তু শেষমেষ তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, তিনি আসলে কোনো কেন্দ্রীয় সূত্রই খুঁজে পাননি, এমনকি কোনো কেন্দ্রীয় পুরাণও নয় (Powell “Derrida” 30-1)।

মন্তব্য

প্রতিটি চিন্তারই আসলে একটি কেন্দ্র থাকে—বৃত্তের যেমন কেন্দ্র থাকে, ধরা যাক তেমন—এটি মূলত ভাবকেন্দ্র; খালি চোখে দেখা যায় না; জ্ঞানচক্ষু দিয়ে ঠাহর করতে হয়। যেমন, নিজেদের আচার-ব্যবহার ও সংস্কৃতি বাদে অন্যান্য আচার-সংস্কৃতি সম্পর্কে ছোটোবেলা থেকেই আমরা নানান উল্টাপাল্টা মন্তব্য করায় অভ্যস্থ। বিশেষ করে, সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে হরহামেশাই একে অপরের ধর্ম, বর্ণ, জাত নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার রেওয়াজ আছে। একে অপরের উদ্দেশ্যে বলা এরকম নিন্দাসূচক প্রবাদতুল্য বাক্যের এক ভাণ্ডার আছে বাংলা ভাষায়, দিন দিন ভাণ্ডারের সেই সম্পদ কমছে তো না-ই, বরং সুদে-আসলে চক্রবৃদ্ধি হারে ক্রমাগত তা যেন বাড়ছেই। যেমন, ছোটোবেলায় শুনেছি/বলেছি, বড়োবেলাতে নানা প্রকারে আরও বেশি শুনছি/বলছি, “হিন্দুরা মাটির ভুইত্যার পূজা করে”। ঘটনা হলো, এই মন্তব্যটি এমন কেউ কখনো করবে না, যে সনাতন ধর্মাবলম্বী, বা সনাতন ধর্মকে সত্য জ্ঞান করে। অনুরূপ একটি মন্তব্য: “গারোরা সাপ-ব্যাঙ খায়”। বাক্যটি ভাবগত যে বিন্দুটিকে ছেদ করে যায় তা এমন কেউ-ই বলতে পারে যে গারো সম্প্রদায়ভুক্ত কেউ নয় অথবা সেই সম্প্রদায় কিংবা সেই সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসকে ঘৃণা বা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে। একইরকম আরেকটি কথা: “মেয়েদের বুদ্ধি কম”। এই রকম উদাহরণের আসলে অভাব নাই। খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভাণ্ডারের সেই সম্পদ থেকে আরও কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া গেলো না। যদিও এই অনুপস্থিতিই এখানে আরও জোরদার উপস্থিতি হয়ে থাকবে।

এখন কথা হলো, ওপরের মন্তব্যগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক কোথায়?—আছে। অর্থাৎ, যার চিন্তার কেন্দ্রে বিরাজ করে সনাতন ধর্মীয় জ্ঞান বা বিশ্বাস, নির্দিষ্ট তিথিতে তিনি প্রতিমায় বরং দেবীর আবির্ভাব উপলব্ধি করবেন। “মাটির ভুইত্যা” তার কাছে পরিণত হবে প্রতিমায়। তেমনি বাকি মস্তব্যগুলোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোনো ব্যক্তির পক্ষে তা উচ্চারণ করা সম্ভব নয়। এইসব মন্তব্য ও পাল্টা মস্তব্যসমূহ আর কিছু নয়—কেন্দ্র ও পরিধির খেলা। বৃত্ত যেমন একটি কাঠামো। তেমনি যেকোনো চিন্তারই একটা কাঠামো থাকে। ধরে নিলাম তা বৃত্তাকার। আর বৃত্তের কেন্দ্র একটিই থাকে। তো, ধর্ম নিয়েই যদি কথা হয়, তবে কোনো একটি ধর্মকে কেন্দ্রে জায়গা দিলে, বাকিদেরকে তা পরিধিতে পাঠাবেই। কারণ, কেন্দ্রের পর পরিধিই বিকল্প জায়গা। দেরিদা দেখিয়েছেন, ইউরোপীয় চিন্তার কাঠামোতেও দুইটিই জায়গা ছিলো: কেন্দ্র আর প্রান্ত। ফলে, একটি ধর্মকে কেন্দ্রে বসালে বাকিদের স্থান হবে পরিধিতে। দেখা যাবে, কেন্দ্রীয় ধর্মটিই তখন পরিধিস্থ অপরাপর ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানোৎপাদন করছে বা জ্ঞানোৎপাদনকে প্রভাবিত করছে। কেন্দ্রের সঙ্গে গাঁটছড়া না বাঁধলে কি পরিধি গড়া যায়?—যায় না। পরিধি আসলে কেন্দ্রের ওপরই নির্ভরশীল। বাদবাকি ধর্মগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। পরিধিস্থ কোনো ধর্মকে এনে কেন্দ্রে বসানো হলে, বাকিগুলোকে সে ঠেলে পাঠাবে পরিধিতে। তখন সেই কেন্দ্রসাপেক্ষেই সত্য উৎপাদিত হবে। মোটকথা, কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত সত্যই অর্থ উৎপাদন করে বা অর্থ তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। জোর প্রয়োগে পরিধিকে নিজের অধিকারে রাখে। এই সুবাদে কেন্দ্রীয় ভাব নিজেকে হাজির করে একমাত্র সত্য রূপে।

কেন্দ্র বদলালেই কেবল উপস্থাপিত সেই একমাত্র-সত্যের চেহারার বদল হয়। আগে যা কেন্দ্রে ছিলো, পরে তা-ই গড়াগড়ি খায় পরিধিতে। দেরিদার আলাপ মূলত এই জিনিসটাই বোঝাতে চায় যে: এভাবে বারবার কেন্দ্র বদলের দ্বারা সত্যের পরিবর্তনশীল রূপটা ধরা পড়ে। আর তখনই কেবল বিদ্যমান, সত্যের শরীরে ঘাপটি মারা, আধিপত্যবাদকে তার আসন থেকে কান ধরে টেনে ওঠানো যায়। ধরা পড়ে কেন্দ্রের জালিয়াতি। আর এই জালিয়াতি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খসে যায় বিদ্যমান সত্যের মুখে আঁটা পবিত্রতার চিরন্তন মুখোশ। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, একটি প্রতীককে গদিচ্যুত করে আরেকটিকে সেখানে বসানো তার মূল কর্মসূচি নয়। দেরিদা দেখলেন, যিশু/গৌতম, গৌতম/কৃষ্ণ, কৃষ্ণ/যিশু এই ধরনের বৈপরীত্য জোড়ই কেবল নয়, পশ্চিমা দুনিয়ার পুরো বাস্তবতাটাই এভাবে গাঁথা হয়েছে বৈপরীত্য ফোঁড়ের (বাইনারি অপোজিশন) বুননে। এবং এই বৈপরীত্য ফোঁড়ের কাঠামোতে কোনো একটি ফোঁড় আবার সুবিধাভোগী—ফলে, প্রভাবশালী। একটি প্রভাবশালী বলে বাকিটা আবার প্রান্তীয়; ফলে, স্তিমিত ও অনুচ্চারিত তার স্বর—তার সত্য। অর্থাৎ, মাঠ এখানে সমতল নয়; খেলা এখানে ‘ফিক্সড’; জয়/পরাজয় এখানে নির্ধারিত। দেরিদা দেখলেন, জোড়ের আধিপত্যবাদী অংশটিই পুরো গঠনটাকে নিয়ন্ত্রণ ও চালিত করে। তাছাড়া ইতিহাসের কোনো বিশেষ পর্বের অসামঞ্জস্য এটি নয়, বরং গোটা পশ্চিমা চিন্তা-কাঠামোতেই তিনি এই প্রবণতা সনাক্ত করলেন। লেখেন:

এটা দেখানোই বরং সহজ যে কাঠামোর ধারণা, এমনকি খোদ “কাঠামো” শব্দটিই জ্ঞান-এর—অর্থাৎ, পশ্চিমা বিজ্ঞান ও পশ্চিমা দর্শন—সমান বয়সী, এমনকি তাদের শিকড় নিত্যনৈমিত্তিক ভাষার গভীর পর্যন্তও বিস্তৃত, যাদের গভীরতম তলদেশে অবগাহনপূর্বক জ্ঞান তাদের তুলে আনে ও রূপকার্থের অদল-বদল মারফত নিজের অংশ করে নেয়। তারপরও, এই ঘটনা পর্যন্ত, যাকে আমি বেছে নিচ্ছি আর নাম দিচ্ছি কাঠামো—বলা ভালো কাঠামোর কাঠামোত্ব—যদিও সবসময় তাকে সক্রিয়ই রাখা হয়েছে, নির্দিষ্ট এক উৎসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে, কেন্দ্র কিংবা উপস্থিতি আরোপণের দ্বারা নিষ্ক্রিয় কিংবা সংকুচিত করা হয়েছে। কেন্দ্রটির ভূমিকা এখানে কেবল কাঠামোটির উপস্থাপন, ভারসাম্য রক্ষণ ও বিন্যস্তকরণ ছিলো না—কারও পক্ষে আসলে অবিন্যস্ত কোনো কাঠামোর কথা চিন্তা করাও সম্ভব না—বরং এটা নিশ্চিৎ করা যে কাঠামোর গাঠনিক সূত্র যাতে আমরা যাকে কাঠামোর লীলা বলবো তাকে নির্ধারিত করে দেয়। কোনো একটি ব্যবস্থার সঙ্গতিকে পেশ করা কিংবা বিন্যস্ত করার মধ্য দিয়ে কাঠামোর কেন্দ্রটি তার অভ্যন্তরস্থ সমগ্র গঠনে উপাদানসমূহের প্রতিযোগিতাটাকে সম্ভব করে তোলে। এমনকি এখনকার সময়েও কেন্দ্র ছাড়া কোনো কাঠামোর কথা অকল্পনীয় ঠেকে। (DERRIDA “Writing” 352 [অনুবাদ: লেখক])

এই ধরনের গঠনবাদী চিন্তার ছাপ আমাদের ভাষার মধ্যেও একদম গেঁথে গেছে। ফলে, চিন্তার সমগ্র পরিসরেই এর প্রভাব বিদ্যমান। এমনকি আমাদের চারপাশের গঠিত বাস্তবতার গভীরেও এর বীজ। নারী/পুরুষ, ভালো/মন্দ, সত্য/মিথ্যা, সাদা/কালো, হিন্দু/মুসলমান, আস্তিক/নাস্তিক, সভ্য/বর্বর এইসব বৈপরীত্য ফোঁড়ে গাঁথা হয়ে আছে আমাদের বাস্তবতা। উদাহরণ দিয়ে পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলা যাবে। দেরিদা দেখলেন, এই ধরনের ভাবাদর্শিক জোড়াজুড়ি না মানলে বাস্তবতার গণ্ডীতেই যেন জায়গা হয় না। আর এভাবে প্রতিটি মন্তব্যই, প্রতিটি সত্যই, কেন্দ্র ও পরিধির সূত্রে গাঁথা। এভাবে আমাদের উচ্চারিত প্রতিটি বক্তব্যই মেনে নেয় বৈপরীত্য ফোঁড়ের গঠন। ফলে, ধ্বংস হয় অর্থের লীলাময় গুণ; অর্থ হয়ে পড়ে স্থির। নির্দিষ্ট অর্থের এই স্থিরতা প্রণয়ন করে এক ধরনের আধিপত্যবাদী সমাজ। সত্য হয়ে ওঠে একরোখা; গড়ে তোলে ফ্যাসিবাদী সমাজ; ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র। সত্য মাত্রই তখন উন্মোচন করে তার ফ্যাসিবাদী চেহারা। যেমন, সামাজিক নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত পুরুষ গড়ে তোলে পুরুষবাদী সত্য। সেই সত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে পুরুষবাদী সমাজ। সেই সমাজে অনুচ্চারিত থাকে নারীর স্বর। নারী সেখানে প্রান্তীয়; তার “বুদ্ধি সেখানে কম”; তার বাস সেখানে “নগরের বাহিরের” অন্তঃপুরে; পরিধিতে। নারী সেখানে নির্মিত হয় পুরুষের মানদণ্ডে; নারী হয়ে ওঠে শরীর-সর্বস্ব; শরীরই হয়ে ওঠে নারীর বিদ্যমান অস্তিত্ব।

মন্তব্যের (চিন্তার) গাঠনিক সমস্যা এখানেই। এটিই “কেন্দ্র”-এর সমস্যা। কেন্দ্র আর পরিধির কাঠামোতে এটিই কেন্দ্রের সন্ত্রাস। এ-কারণেই, রাষ্ট্রের কেন্দ্রে বাঙালি হয়ে অবস্থান করলে অপরাপর জাতিসত্তার সত্য আর দেখা যায় না, বরং “বিচিত্র কাপড়ে বাঁধা ঘামে ভেজা উপচানো বুকে বনের রহস্যকে কাঁপতে” দেখা যায়। সেই রহস্য (সত্য) অধীনস্ত, আয়ত্তাধীন, তাকে জয় করা যায়। আর তারা “নগরের বাহিরের ডোম্বী”। ফলে, তার সত্যও তখন নগরের বাইরের সত্য (রহস্য)। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আসলে এই প্রাধিকারকে চিহ্নিত করা যায়। বিনির্মাণ-এ কাঠামোর এই ঠাসবুননটিই আলগা হয়ে পড়ে। দুই ফোঁড়ের মাঝখানের সুতা ধরে এটি এমন টান দেয়, পলকেই আলগা হয়ে আসে বাঁধন। প্রকাশ্য দিবালোকে স্পষ্ট হয়ে পড়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার ফ্যাসিবাদী রূপ।

গন্তব্য

বিনির্মাণ তাহলে কোথায় পৌঁছে দেবে?—নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চিন্তার কেন্দ্র থেকে উচ্চবর্ণের হিন্দুকে সরিয়ে আশরাফ মুসলমানকে বসিয়ে দিলেই হয়? আশরাফ মুসলমানকে সরিয়ে বাঙালিকে বসিয়ে দিলেই হয়?—হয়নি তো। এখন বাঙালিকে সরিয়ে অপরাপর জাতিগোষ্ঠীকে বসালেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?—দেরিদাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলে, তার উত্তর হবে—না, সমস্যার সমাধান হবে না। যেমন, পাকিস্তানিদের হটিয়ে কেন্দ্রে বাঙালিরা অবস্থান নেওয়ার পরেও আধিপত্যবাদের অবসান হয়নি; অপরাপর জাতিসত্তার প্রান্তীয়করণ থেমে যায়নি, যেন আরও বেড়েছে। অর্থাৎ, সমস্যার সমাধান হয়নি। তেমনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বদলে নারীতান্ত্রিক সমাজ কোনো সমাধান নয়। বিনির্মাণ-এর লক্ষ্যও আসলে, কেন্দ্র বদল মারফত, সমস্যার সমাধান করে ফেলা নয়। বলা যায় বিনির্মাণ-এর দ্বারা অবদমিত সত্যগুলো তাদের কণ্ঠে ভাষা ফিরে পায়—এটি নির্দেশ করে সত্যের লীলাময় চরিত্র—তার পরিবর্তনশীলতা, তার ক্ষণস্থায়িত্ব। যার ফলে, যাবতীয় আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সামাজিক শর্ত গড়ে ওঠে; সৃষ্টি হয় প্রান্তিক গোষ্ঠীসমূহের সঙ্গে কাতারে কাতার মেলানোর যৌক্তিক পটভূমি; প্রস্তুত হয় সামাজিক নীতি নির্ধারণের অবাধ পরিসর।

বিনির্মাণ-এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে এক-ধরনের সমতলীয় ক্ষেত্র, যেখানে খেলা করে অর্থের বহুমাত্রিকতা। দেরিদা একে “খেলা” বলেই চিহ্নিত করেন। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া তার সেই বিখ্যাত বক্তৃতার শিরোনামেই এই “খেলা” শব্দটি ছিলো। এই খেলা, ভাবের খেলা, অর্থময়তার খেলা—অবাধ খেলা—যেখানে কোনো প্রকার কর্তৃত্বই আর প্রশ্রয় পায় না। একে “লীলা” ধারণাটি দিয়ে বুঝলেই বরং সুবিধা। অর্থাৎ, যেকোনো পাঠ্যজুড়ে বিরাজ করে অর্থময়তার এক অপার লীলা। একজন বিনির্মাণবাদী প্রথমেই পাঠ্যের অভ্যন্তরে নিহিত বৈপরীত্য ফোঁড়ের বুননটি চিহ্নিত করেন, তারপর দেখান যে, পাঠ্যে তারা পরস্পর কীভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছে। অর্থাৎ, তাদের একটি অংশ কীভাবে কেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে, বাকি অংশটিকে করে তুলেছে প্রান্তীয়; কীভাবে প্রভাবশালী অংশটি জারি রেখেছে আপন কর্তৃত্ব; এরপর ক্ষণস্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় অর্থকে তিনি প্রান্তীয় অর্থ দ্বারা বদলে দেন, অস্থির করে দেন, নস্যাৎ করে দেন। সেই সুবাদে, প্রান্তীয় অর্থটিও আবির্ভূত হয় তার প্রকৃত চেহারায়, আর প্রকাশিত করে: অর্থময়তার লীলা।

কমতি

বিনির্মাণবাদীরা তাহলে কোনো একটি তত্ত্বপর্যালোচনার সময় সেই তত্ত্বে বিদ্যমান কেন্দ্রাভিমুখিতা সনাক্ত করেন; ভাঁজ খুলে দেখান যে, সেই তত্ত্বেরগঠনকাঠামোয় কীভাবে একটি কেন্দ্রীয় টান ক্রিয়াশীল রয়েছে; এবং তা নির্দেশিত হয় সেই চিন্তার কমতি হিসেবে। সেই হিসেবে একজন বিনির্মাণবাদীকে তো চিন্তার দিক থেকে থাকতে হবে একদম শূন্য—অবাধ ও নিরপেক্ষ—এক “ ব্ল্যাঙ্ক ডিস্ক”; ভালো মন্দ কিছুই যেখানে আগে থেকে “আপলোড” করা নাই। ফলে, তার কাজ হবে নৈর্ব্যক্তিক; তিনি কাজ করবেন বিষয়গত পার্থক্যের ভিত্তিতে; অর্থাৎ, শেষাবধি যে কেন্দ্রীয় টানটি সনাক্ত হবে তা মূলত পাঠ্যেই নিহিত থাকবে, বিনির্মাণবাদীর মাথায় অন্তত নয়। কিন্তু রবার্ট উইকস এতে বাদ সেধেছেন। তিনি খোলাসা করে জানিয়ে দিলেন তার আপত্তির কথা। তার কথা হলো:

If we consider examples of Derrida’s own deconstructions, for instance, we notice that they are impressively imaginative, and are unlikely to have been duplicated by anyone who might have been independently deconstructing the same text. This is due, significantly, to Derrida’s own wealth of knowledge… The deconstructor is thus very far from acting as the objective force of difference when approaching a text. The deconstructor always operates with a wealth of background presuppositions, and unavoidably brings these to bear on the activity of discerning the text’s tensions and internal conflicts. Any particular deconstruction, then, will carry the mark of the deconstructor. (Wicks 215)

রবার্ট উইকসের আপত্তি—বিনির্মাণবাদীরা যেকোনো প্রকার পূর্বানুমান থেকে নিজেদের দূরে রাখতে অপারগ। এমনকি এটা হতে পারে তাদের ব্যক্তিগত দক্ষতার মতো ব্যাপার। নয়তো একই পাঠ্য বিনির্মাণ করার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে এতো গরমিল কেন! এছাড়া তিনি বিনির্মাণ-এরও “ব্যাকগ্রাউন্ড” তত্ত্বেরকথা তুললেন। তার কথা হলো, কমনসেন্সের খাতিরে হলেও একজন বিনির্মাণবাদীকে চিন্তার কোনো একটি গড়পড়তা সেটের প্রতি আস্থাশীল হতেই হয়। তার ভাষায়:

The deconstructor may be aware of the metaphorical resonance of language, but this does not imply that the finite consciousness of the deconstructor operates within the world without a determinate perspective. This perspective constitutes a background theory, as the deconstructionist understands the term, if only in the rudimentary sense of containing basic distinctions and priorities – distinctions and priorities such as that between physical objects and hallucinations, mirages, afterimages, etc. The deconstructor’s consciousness (and everyone’s consciousness) is thus constituted by a theory in fusion with the metaphorical resonance that attends the term of that theory. (Wicks 215)

রবার্ট উইকসের প্রস্তাবনাসমূহ বিনা সন্দেহে পর্যালোচনার দাবিদার। এছাড়া, মার্কসবাদীরাও বিনির্মাণ-এর সমালোচনা করেন। কারণ, এই প্রক্রিয়ায় কোনো পজিশনই তৈরি হয় না দাঁড়াবার। এই বৈশিষ্ট্যকে তারা বিনির্মাণ-এর এক-রকম কমতি হিসেবেই দেখিয়ে থাকেন।

শেষ

“বিনির্মাণ” শব্দে এক-ধরনের কাঠামোবাদী মেজাজ ছিলো, দেরিদাই বলছেন, সময়টাই ছিলো কাঠামোবাদের। তাছাড়া বিনির্মাণ তো কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেয়ই। তারচেয়েও বড়ো কথা, এক-ধরনের কাঠামোবাদী সমস্যাক্ষেত্র তার ঠিকই দরকার পড়ে (Derrida “Letter” 2)। আবার বিনির্মাণ যেহেতু কাঠামোবাদী চিন্তার সংকটগুলো দেখায়, সে-কারণে আমেরিকতাতে তাকে উত্তরকাঠামোবাদী চিন্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে ভাবা হয়। মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকা থেকে ফ্রান্সে ঢোকার আগ-পর্যন্ত ফরাসিদের কাছেই “উত্তরকাঠামোবাদ” শব্দটি পরিচিত ছিলো না (Derrida “Letter” 3)। যে প্রসঙ্গ তুলে আলোচনাটি আমরা শেষ করতে চাই তা হলো: দেরিদার বিনির্মাণ বোঝার ক্ষেত্রে তার অবস্থান নিয়ে সচেতনতা। অর্থাৎ, তার চিন্তার প্রেক্ষিত, পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয়তা বোঝা। যেমন, কট্টর এক কাঠামোবাদী প্রেক্ষিতই দেরিদার মতো একজন চিন্তকের বিকাশের রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলো। একইভাবে, এই কথাটাও মনে রাখা দরকার, পশ্চিমা চিন্তা-পদ্ধতির সংকট চিহ্নিত করে পশ্চিমা চিন্তাকে সে বরং আরও শক্তিশালীই করে তুলেছে। সে নিজেও সেই চিন্তা-পদ্ধতিরই উত্তরাধিকার।

এখন তার আলাপ যেখানে যেখানে আমাদের সহায়ক হয়, সেখানে সেখানে তার বন্ধুত্ব আমরা গ্রহণ করতেই পারি। আর যদি কেউ বলতে চায়, দেরিদার “দ্বিকোটি বিনির্মুক্ত”-এর আলাপের চাইতে, আমাদের বৌদ্ধ চিন্তাতেই তো আছে চতুষ্কোটি বিনির্মুক্তের ধারণা। তাকে তখন বলতে হবে, এই আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইলো।

দ্রষ্টব্য: বর্তমান প্রবন্ধটি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত সমগ্র থেকে পুনর্মুদ্রিত হলো।

সহায়কপঞ্জি

স্পিভাক, গায়ত্রী চক্রবর্তী। “অবিনির্মাণ”। অপর। অনুষ্টুপ, ২০২২।

Derrida, Jacques. Writing and Difference. Trans. Alan Bass. Routledge, 2001.

Derrida, Jacques. “Letter to a Japanese Friend”. Derrida and Difference. Ed. David Wood & Robert Bernasconi. Northwestern University Press, 1988.

Onushilon. http://onushilon.org/ovidhan/b/bi.htm

Powell, Jim. Derrida for Beginners. Orient Longman, 2003.

Powell, Jim. Deconstruction for Beginners. For Beginners, 2008.

Wicks, Robert. Modern French Philosophy from Existentialism to Postmodernism. Oneworld, 2003.

লেখাটি শেয়ার করুন