The police have always been political.
Alex S. Vitale
জবরদস্তিমূলক পুলিশিং হলো রাজনৈতিক পুলিশিং। যে পুলিশ জনগণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র সরকাররক্ষায় নিয়োজিত থাকে তার জবরদস্তিমূলক হয়ে ওঠাই ভবিতব্য। সরকার জনগণ থেকে যত বিচ্ছিন্ন হয় এবং দুর্বল হয় তার পুলিশিং ততো জবরদস্ত হয়। কারণ জোর করে ক্ষমতায় থাকার সহজতম তরিকা হচ্ছে অতি পুলিশিং এর মাধ্যমে ভয়ের সংস্কৃতি নির্মাণ করা। যদিও এ পদ্ধতি সমাজে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে যে শক্ত পুলিশিং শক্ত জবাব ডেকে নিয়ে আসে এবং আখেরে তা সদর্থক ফলাফল উৎপাদনে ব্যর্থ হয়। তবুও দুনিয়াব্যাপি অজস্র সরকার এ পদ্ধতিকেই বেছে নেয়। কারণ লুটেরা সংস্কৃতি জনসেবা ও জনবন্ধুত্বকে কঠিনতম কাজ হিসেবে ঠাওরায়। কিন্তু, প্যারাডক্সিকাল ব্যাপার হলো সকল শোষককে তার স্বার্থ ঠিকমতো সিদ্ধির জন্য অপরাধের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন হওয়ার বা জনসেবার মিথ নির্মাণ করতে হয়। বর্তমান লেখা এই মিথ ভাঙার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।
দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো ভারতবর্ষে পুলিশের জন্মই জবরদস্তিমূলক পুলিশিং হিসেবে। এ কারণে শুরু থেকেই এই বাহিনী সামরিকায়নের ভেতর দিয়ে যাত্রা করেছে যদিও বাহিনী হিসেবে পুলিশের জন্ম সামরিকীকরণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে। ১৮১৯ সালে ইংল্যান্ডে পিটারলু হত্যাকাণ্ডের পরে জনগণের ভেতরে সেনাবাহিনীকে নিয়ে যে প্রবল বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা তৎকালীন শাসকদের বাধ্য করে সেনাবাহিনীর বাইরে অন্য কোন অসামরিক নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করতে। এরই ফলস্বরূপ ১৮২৯ সালে সৃষ্টি হয় লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ। অসামরিক হিসেবে পরিকল্পিত হলেও পুলিশের সামরিকীকরণের ইতিহাস তার অসামরিক চেহারার চেয়েও পুরনো। কারণ ১৮২৯ সালের লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের পূর্বেই ১৮২২ সালে সৃষ্টি হয় রয়েল আইরিশ কন্সটাবুলারি (আরআইসি), যা ছিল দুনিয়ার প্রথম আধুনিক পুলিশ বাহিনী এবং তার চরিত্র ছিল আধাসামরিকধর্মী। ফলে অসামরিক ও আধাসামরিক বা সামরিক পুলিশের ধারণা ইতিহাসে একত্রে পথ চলেছে হাতে হাত ধরে ধরে। পুলিশের সামরিকীকরণ একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। পুলিশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কেমন হবে তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সরকারের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের উপর। ইতিহাসের সাক্ষ্য নিশ্চিত করে যে সরকার যত দুর্বল হবে অর্থাৎ জনগণ থেকে যত বিচ্ছিন্ন হবে তার পুলিশ তত শক্ত বা সামরিকধর্মী হবে। সরকার জনগণের বন্ধু না হলে হঠাৎ করে পুলিশ জনগণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না। জন্মলগ্ন থেকেই পুলিশ রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঔপনিবেশিক ভারতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভারতে পুলিশের জন্ম সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক পরপরই যদিও এর প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলের নেতৃত্বে। সিপাহী বিদ্রোহ প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করে। ১৮৮৫ সালে ভারতে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে তৎক্ষণাৎ পুলিশ বিভাগ গোয়েন্দা তৎপরতার প্রয়োজন অনুভব করে এবং ১৮৮৭ সালে সেন্ট্রাল স্পেশাল ব্রাঞ্চ গঠিত হয়। গোয়েন্দা তৎপরতার ইতিহাস এখানে সরকারকে রক্ষার তৎপরতার ইতিহাস। জনগণের সেবার তুলনায় ঔপনিবেশিক পুলিশের কাছে ঔপনিবেশিক শাসকের সাম্রাজ্য ও স্বার্থ রক্ষা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেকারণেই পুলিশকে ক্রমাগত সামরিকায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ তারই উত্তরাধিকার।
পুলিশের সামরিকীকরণ শাষকগোষ্ঠীর জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। বর্তমান লেখায় জবরদস্তিমূলক পুলিশিং ও তার রাজনৈতিক উৎপাদ আলোচনা করা হবে। এটি মূলত সেকেন্ডারি ডেটা নির্ভর লেখা, যা ভবিষ্যৎ এম্পিরিকাল স্টাডির জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। লেখাটি প্রধানত দুইটি অংশে বিভাজিত। প্রথম অংশে জবরদস্তিমূলক পুলিশিংয়ের ইতিহাস ও দ্বিতীয় অংশে তার রাজনৈতিক উৎপাদ আলোচনা করা হবে।
জবরদস্তিমূলক পুলিশিংয়ের ইতিহাস
জবরদস্তিমূলক পুলিশিংয়ের প্রধান শর্ত হলো এর সামরিকায়ন। সামরিকীকরণ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি সেনাবাহিনীর মতো ভারি অস্ত্র-সরঞ্জামে সজ্জিতকরণ। কিন্তু, বর্তমান লেখায় সামরিককরণকে একটি সাংস্কৃতিক ধারণা হিসেবে ব্যবহার করা হবে। নৃবিজ্ঞানী Catherine Lutz সামরিককরণ বলতে বুঝান—
Militarization is simultaneously a discursive process, involving a shift in general societal beliefs and values in ways necessary to legitimate the use of force, the organization of large standing armies and their leaders, and the higher taxes or tribute used to pay for them. (Lutz 2007, 320)
Lutz এর এই সংজ্ঞার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামরিকীকরণ প্রক্রিয়ার সাথে সামাজিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধের পরিবর্তনকে যুক্ত করা। সামাজিকীকরণ কেবলমাত্র অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার নয়। সামরিকীকরণ হলো জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োগ ও তার বৈধতা উৎপাদন। এজন্য আমি সামিরীককরণের সাংস্কৃতিক পাঠে আগ্রহী। একে সাংস্কৃতিক ব্যপকতায় পাঠ না করলে বাংলাদেশে সামরিকীকরণ বলতে কেবল বুঝাবে র্যাবের প্রতিষ্ঠা ও পুলিশের আন্দোলন দমনের ভূমিকা। কিন্তু, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বৃহত্তর রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং ভয়ের সংস্কৃতির সাথে পুলিশের সামরিকীকরণের সম্পর্ক এই আলোচনার বাইরে থেকে যাবে।
সামরিকীকরণকে অপরাধবিজ্ঞানী Peter B. Kraska দেখেন মূলত একটা ভাবাদর্শ হিসেবে। তিনি বলেন—
Militarism, in its most basic sense, is an ideology focused on the best means to solve problems. It is a set of beliefs, values, and assumptions that stress the use of force and threat of violence as the most appropriate and efficacious means to solve problems. It emphasizes the exercise of military power, hardware, organization, operations, and technology as its primary problem-solving tools. Militarization is the implementation of the ideology, militarism. It is the process of arming, organizing, planning, training for, threatening, and sometimes implementing violent conflict. To militarize means adopting and applying the central elements of the military model to an organization or particular situation. (Kraska 2007, 504)
Kraska -এর আলাপের সূত্র ধরে বলা যায় পুলিশের সামরিকীকরণ আসলে রাষ্ট্রীয় জবরদস্তিমূলক আচরণের একটি ফসল। পুলিশের জবরদস্তিমূলক আচরণ, ভয়ের সংস্কৃতি নির্মাণ, হেফাজতে নির্যাতন এই সবই একটি সামরিক দৃষ্টিভঙ্গীর ফসল। এই সামরিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আবার একা হাতে আসে না। এটি সম্মতিভিত্তিক শাসনের সম্ভাবনাকে অবিশ্বাস ও অনাস্থার চাষাবাদের মাধ্যমে একেবারে নস্যাৎ করে দেয়। এই কারণে আমাদের রূপালী পর্দার নায়কেরা সদা প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হয়ে থাকে। নায়ক চরিত্র একজন পুলিশ এমন সিনেমা বিশ্লেষণ করলে একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। সেটা হলো নায়ক একজন আদর্শবান পুলিশ অফিসার। কিন্তু, সে আদর্শবাদী হওয়ার কারণেই বিপদে পড়বে। এরপর তাকে আইনের বাইরে গিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সে আসলে নায়ক হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে আইনের সীমা অতিক্রম করে। এটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থার একটি সূচক। আবার, প্রকারান্তরে তা সামরিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকেই আবার সাংস্কৃতিকভাবে আরও বৈধতার যোগান দেবে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে সামরিকতাবাদ এমন এক দুষ্টচক্র তৈরি করে যার ফলাফল তার কারণকেই শক্তিশালী করে।
ভারতে পুলিশের জন্মই আধাসামরিক বাহিনীর আদর্শে। অর্থাৎ আরআইসির মডেলকে অনুসরণ করে। ভারতীয় পুলিশের জনক চার্লস নেপিয়ার ১৮৪১ সালে প্রথম ভারতে আসেন এবং ১৮৪৩ সালের মধ্যেই সিন্ধু অঞ্চলে বৃটিশ দখলদারিত্ব নিশ্চিত করেন। পুলিশ আইন প্রতিষ্ঠার দেড় দশক পূর্বেই তিনি ভারতে পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তার গঠিত বাহিনীর অনুসরণেই ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৪৬ সালে নেপিয়ার একটি কৌতুহলোদ্দীপক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি সেনাবাহিনীর সাথে পুলিশ বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য চিহ্নিত করেন। তার মতে, সেনাবাহিনীর কাজ হলো ঘোষিত শত্রুর সাথে লড়াই করা। অপরপক্ষে পুলিশ বাহিনীর কাজ হচ্ছে জনপ্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা প্রহরা নিশ্চিত করা ও অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা। তার মতে সেনাবাহিনীর জনগণের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ বা জনসমাজে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে এবং গচ্ছিত থাকার মাধ্যমে তার যে ক্ষমতা প্রদর্শিত হয় তা কমে যাবে। ফলে নেপিয়ার মূলত সেনাবাহিনীর এক ধরনের বিকল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা সামরিক বাহিনীর সম্পূরক হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে একদম গোড়া থেকেই বৃটিশ ভারতে পুলিশ বাহিনী সৃষ্টি হয়েছে আধাসামরিক ঢংয়ে। নেপিয়ার গর্বের সাথে দাবি করেন—
I established a strong police of two thousand men, well armed, well drilled, and divided into three classes, one for the towns, and two for the country…The whole system appears to work well, and the police not only seize every thief, but are very good troops. I took a large detachment into the hills to make soldiers of them. (Cox 1911, 67-68)
নেপিয়ার শুরু থেকেই একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠনে মনোযোগী ছিলেন। ঔপনিবেশিক ভারতে পুলিশের সামরিকীকরণের কারণ হিসেবে David Arnold কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করেন—সামরিকবাহিনী মোতায়েনের ব্যায়বহুলতা, গৌন ঝামেলায় তাদের ব্যবহার করা হলে বাহিনীর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা এবং জনগণের সাথে পরিচিতির ফলে তাদের ক্ষমতাধর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়ে পড়া। ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধলে পুলিশের সামরিকায়ন পালে জোর হাওয়া পায় এবং এই সামরিকায়ন ঘটে আরআইসির আদলে। এ ব্যাপারে Arnold বলেন—
However, within the areas of effective control the colonial authorities soon found unarmed policemen insufficient to protect the regime from the assaults of communal, nationalist and labour agitation. The colonial police were, therefore, given a more military character than was acceptable at home. With the army kept in reserve for major emergencies, part of the constabulary was adapted to meet the need for an armed repressive agent, and this led to the creation of paramilitary police forces in the later stages of colonial rule. For these Ireland, so often the pioneer and paradigm in British colonial experience, provided the model: it was on the lines of the Royal Irish Constabulary that colonial governments built their paramilitary police. (Arnold 1977, 102)
অথচ ইংল্যান্ডে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠিত হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন আদলে। এই পুলিশের মূল চরিত্র ছিল সম্মতিভিত্তিক। রবার্ট পিলের নেতৃত্বে ১৮২৯ সালে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট নির্মিত হয় তিনটি প্রধান ধারণাকে কেন্দ্র করে। ধারণা তিনটি হল—
- The goal is preventing crime, not catching criminals. If the police stop crime before it happens, we don’t have to punish citizens or suppress their rights. An effective police department doesn’t have high arrest stats; its community has low crime rates.
- The key to preventing crime is earning public support. Every community member must share the responsibility of preventing crime, as if they were all volunteer members of the force. They will only accept this responsibility if the community supports and trusts the police.
- The police earn public support by respecting community principles. Winning public approval requires hard work to build reputation: enforcing the laws impartially, hiring officers who represent and understand the community, and using force only as a last resort. (Sir Robert Peel’s Policing Principles n.d.)
লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ অ্যাক্ট ১৮২৯ নির্দেশ করে ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের নিজ দেশে ও উপনিবেশিত অঞ্চলে কী পরিমাণ ভিন্নধর্মী পুলিশি ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করেছিলেন। এর কারণ ছিল ‘আত্ম ও পর’ এর ধারণা। ভারতীয়রা তাদের কাছে ছিল বর্বর ও অসভ্য। ১৮৬০ সালের সিলেক্ট কমিটির মিটিংয়ে কমিটির সদস্য স্যার বাটল ফ্রেয়া সভাপতি বার্নস পিককের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, Flogging was a very useful punishment, particularly in several parts of the country where the people were in a state of semi-barbarism.” (Mukhopadhyay 1998, 256) অর্থাৎ ভারতীয়দের আধা-বর্বর তকমা দানের মাধ্যমে তাদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু, স্বাধীনতা লাভের পরও কেন ঔপনিবেশিক সামরিকতাবাদী পুলিশি ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনও চলমান তার উত্তর খুঁজতে জবরদস্তিমূলক পুলিশিংয়ের রাজনৈতিক উৎপাদের সুলুক সন্ধান জরুরি।
জবরদস্তিমূলক পুলিশিং ও তার রাজনৈতিক উৎপাদ
জবরদস্তিমূলক পুলিশিং কীভাবে কাজ করে সে আলাপে আমি শুরুতেই যাব রিমান্ড প্রশ্নে। বাংলাদেশে রিমান্ড সংক্রান্ত আইন এবং বাস্তবে তার প্রয়োগের ফারাক প্রায় সর্বজনবিদিত। কিন্তু পুলিশি নির্যাতনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে নির্যাতনকে দেখা হয় একটি নায্য সহিংসতা হিসেবে। এর পেছনের দর্শন হচ্ছে শরীরে ব্যাথা উৎপাদন করলে সেটা সহ্য করতে না পেরে মানুষ সত্য কথাটা বলতে বাধ্য হয়। এই দর্শন মূলত একটি ঔপনিবেশিক দর্শন কারণ ঔপনিবেশিকরা মনে করতো আধা-সভ্যরা সহজে সত্য বলবে না। ফ্রেডরিক কুপার তার ক্রাইসিস ইন পাঞ্জাব বইয়ে এই কারণেই উপনিবেশিতদের নির্যাতনের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এই ঔপনিবেশিক দর্শন বাংলাদেশে হাজির হয়েছে সাধারণ দর্শন হিসেবে। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে ব্যাথাক্রান্ত শরীর সত্য বলতে পারে কিনা? Elaine Scarry তার The Body in Pain গ্রন্থে দেখিয়েছেন অসহ্য ব্যাথা কীভাবে ভাষাকে ধ্বংস করে। এই কারণে ব্যাথাক্রান্ত হলে আমরা এমন ধরনের আওয়াজ করি বা কাঁদি, যা ভাষাপূর্ব আচরণকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, ব্যাথা ও ভাষা একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কে জড়িত। ফলে অসহ্য ব্যাথা সত্য উৎপাদনতো দূরের কথা ভাষাই উৎপাদন করতে পারে না। ফলে ব্যাথাক্রান্ত শরীর মূলত তা-ই বলে যা বললে তার ব্যাথার উৎপাদন বন্ধ হবে। Scarry দেখান নির্যাতন একটি বিমানবায়ন প্রক্রিয়া। কোন মানুষের মানবিক পরিচয়, তার সচেতনতা, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক আদর্শ এই সব কিছু অসহ্য ব্যাথা নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। তখন একমাত্র সত্য হয়ে ওঠে ব্যাথা ও ব্যাথামুক্তির কামনা। Scarry বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে—
Torture systematically prevents the prisoner from being the agent of anything and simultaneously pretends that he is the agent of some things. Despite the fact that in reality he has been deprived of all control over, and therefore all responsibility for, his world, his words, and his body, he is to understand his confession as it will be understood by others, as an act of self-betrayal. In forcing him to confess or, as often happens, to sign an unread confession, the torturers are producing a mime in which the one annihilated shifts to being the agent of his own annihilation. But this mime, though itself a lie, mimes something real and already present in the physical pain; it is a visible counterpart to an invisible but intensely felt aspect of pain. Regardless of the setting in which he suffers (home, hospital, or torture room), and regardless of the cause of his suffering (disease, burns, torture, or malfunctioning of the pain network itself), the person in great pain experiences his own body as the agent of his agony. (Scarry 2020, 47)
ব্যাথাক্রান্ত বিমানব যেহেতু কোন সত্য উৎপাদন করতে পারে না এই কারণে আইনেও জোরপূর্বক নেয়া স্বীকারোক্তিকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কেনো আইনের প্রদীপের নীচেই এই অন্যায় চর্চা চলতে থাকে? এর উত্তরটা খুঁজতে হবে নির্যাতনের রাজনীতিতে। নির্যাতনের উদ্দেশ্য সত্য উদঘাটন নয়। এর উদ্দেশ্য ক্ষমতা প্রদর্শন এবং ভয়ের সংস্কৃতি নির্মাণ। ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট ডেইলি স্টারের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত এস এম রানার আয়নাঘরের অজিজ্ঞতাও নির্দেশ করে যে জিজ্ঞাসাবাদে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগী কী উত্তর দিলেন বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কীভাবে উত্তর দিলেন এবং কতখানি যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেলেন।তার উত্তর এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ না যে, তার উত্তর হবে ঠিক তাই যা তার কাছে চাওয়া হচ্ছে। রিমান্ডে নির্যাতন হচ্ছে নাগরিকের পরিচয় মুছে দিয়ে তাকে বিমানব করার চেষ্টা।
বাংলাদেশে পুলিশ যেভাবে গত দুই দশকে সামরিকায়িত হয়েছে তাতে অপরাধের হার কমেছে কিনা তা এম্পিরিক্যাল স্টাডির বিষয়। তবে সমাজতাত্ত্বিকরা দাবি করেন শক্ত পুলিশিং শক্ত অপরাধের জন্ম দেয়। Alice Goffman তার নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে শক্ত পুলিশিং সমাজের ভেতরে এই ধরনের পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধের জন্ম দেয়। Goffman ফিলাডেলফিয়ার সিক্সথ স্ট্রিটে একটি ঘেটোতে এথনোগ্রাফিক স্টাডি করেন। সেখানে তিনি দেখতে পান যে একজন ১৯ বছর বয়সী যুবক তার ১২ বছর বয়সী ছোট ভাইকে কীভাবে পুলিশের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করেছে। তার উক্তিটি ছিল এরকম—
You hear the law coming, you merk on [run away from] them niggas. You don’t be having time to think okay, what do I got on me, what they going to want from me. No, you hear them coming, that’s it, you gone, period. Because whoever they looking for, even if it’s not you, nine times out of ten they’ll probably book you. (Goffman 2009, 344)
জবরদস্তিমূলক পুলিশিং, অতি গ্রেপ্তার, অতি নির্যাতন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। এ ধরনের পুলিশি ব্যবস্থার কোন নৈতিক গ্রহনযোগ্যতা সমাজে তৈরি হয় না বলে পুরো নৈতিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। Goffman দেখিয়েছেন সিক্সথ স্ট্রিটের বাচ্চারা তাদের খেলার ছলে কীভাবে পুলিশি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। তার জবানিতে একটি ঘটনা এরকম—
Children learn at an early age to watch out for the police and to prepare to run. The first week I spent on 6th Street, I saw two boys, 5 and 7 years old, play a game of chase in which one assumed the role of the cop who must run after the other. When the “cop” caught up to the other child, he pushed him down and cuffed him with imaginary handcuffs. He patted the other child down and felt in his pockets, asking if he had warrants or was carrying a gun or any drugs. The child then took a quarter out of the other child’s pocket, laughing and yelling, “I’m seizing that!” (Goffman 2009, 343)
বাংলদেশে ‘চল যাই যুদ্ধে মাদকের বিরুদ্ধে’ অভিযানটি শুরু হয় ২০১৮ সালের ৪ মে। এ অভিযানে ২০২২ সাল পর্যন্ত কেবলমাত্র কক্সবাজারেই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হয় ২৯৯ জন। ২০২৩ সালে আবারও ঘোষণা করা হয় মাদকের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ। এবার তালিকা করা হয় ৯৩ জনের নাম। এই অভিযানে আলোচিত নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন একরামুল। কিন্তু, এই যুদ্ধ কতখানি মাদক আটকাতে পেরেছে সেদিকেও নজর দেয়া দরকার। ২০২২ সালের প্রথম আলোর একটি রিপোর্ট বলছে, দেশে ইয়াবার ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেছে। আমদানি হয়েছে আইস, খাট, ম্যাজিক মাশরুমসহ অন্যান্য নতুন ধরনের সব মাদক। (সাবিহা ২০২২)
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ৫ বছরে মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়েছে ৩০ লাখ। (অহন ২০২৪) অর্থাৎ, যখন থেকে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তখন থেকে মাদকের আমদানী ও মাদকসেবীর সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। তবুও বিগত সরকার এই অভিযান বীরদর্পে চালিয়ে গিয়েছে কেন? এটি আদতে একটি রাজনৈতিক অভিসন্ধিকে সিদ্ধ করে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একই সাথে রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তির প্রদর্শনী এবং আরেকদিকে জনগণের থেকে এর বৈধতা লাভের চেষ্টা। কারণ মাদকের নামে পেশি-শক্তির প্রদর্শন করলে তা অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা লাভ করার কথা।
বৃটিশ আমল থেকেই ভারতীয় তথা বাংলা অঞ্চলে পুলিশিং মানেই জবরদস্তিমূলক পুলিশিং। বাংলা অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ঠেকাতে কলকাতায় কলকাতা স্পেশাল ব্রাঞ্চের পত্তন হয়। আর এটি সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৯০১ সালে ভারতীয় পুলিশে যোগ দেন স্যার চার্লস টেগার্ট নামের একজন আইরিশ পুলিশ। এই টেগার্ট জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও বিদ্রোহ দমনকেন্দ্রিক গোয়েন্দাগিরি ও নজরদারিতে সুপ্রসিদ্ধ। কলকাতায় তিনি এত সাফল্য পেয়েছিলেন যে পুলিশ উপদেষ্টা হিসেবে পরবর্তী সময়ে তাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আরেক অগ্নিক্ষেত্র ফিলিস্তিনে পাঠানো হয়। জনগণের পুলিশ নামের মিথের আড়ালে পুলিশ আমাদের এখানে সরকার রক্ষার হাতিয়ার। শাসক ও শাসিতের মধ্যে বোঝাপড়ার সম্পর্ক না থাকার কারণে এবং শাসিতকে বিমানব হিসেবে দেখার কারণে বাংলাদেশের সরকার জনগণকে শক্তি হিসেবে বিবেচনা না করে শোষণের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে এবং অন্তর্নিহিত ভীতিবশত তাকে দমিয়ে রাখার কৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু, এই কৌশল আখেরে অধিক অপরাধ প্রবণতার জন্ম দেয়। কারণ দমন-পীড়ন সরকারের নায্যতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ন্যায়সঙ্গত আচরণ সুদূরপরাহত হয়ে ওঠে তখন সমাজে অপরাধও এক ধরনের বৈধতা লাভ করে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির পথ কী হতে পারে সে প্রসঙ্গে অপরাধবিজ্ঞানী Tracey L. Mears বলেন—
Research in psychology indicates that an individual’s willingness to voluntarily comply with the law is connected to the manner in which governmental authorities treat the individuals. What matters is whether individuals think that authorities think that individuals count as manifested in the way that authorities behave. Thus, the group value theory of legitimacy predicts that those who are treated politely, with respect, and in an egalitarian fashion will be more likely to comply with the law than those subject to rules enforced through coercive methods under a hierarchical structure of relationships between authorities and the governed. (Mears 2000, 404-405)
জনগণকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আইন মান্য করতে উৎসাহিত করা না গেলে শুধু কঠোর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। কঠোর পুলিশিং কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারঙ্গম কিন্তু তা প্রকারান্তরে অপরাধকে বাড়িয়ে তোলে। সেক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ত পুলিশিংয়ের বিভিন্ন মডেল দুনিয়াব্যাপি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের কার্যকর পরিবর্তনে বাংলাদেশেরও এমন প্রোগ্রাম হাতে নেয়া উচিৎ এবং তা হতে হবে বৃহত্তর রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনীতির সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে।
শেষকথা
স্বাধীনতা মানে হলো পুরনোকে ভেঙে নতুন করে গড়বার ক্ষমতা লাভ। পুলিশের ঔপনিবেশিক কাঠামো ও দর্শন অব্যাহত রাখার অর্থ হলো স্বাধীনতাকে কার্যত অর্থহীন করে তোলা। বাংলাদেশে এখন অব্দি পুলিশিং মোটাদাগে জনসেবায় ব্যর্থ এবং সরকারসেবায় সফল। এর কারণ হলো সেবার ধারণার অনুপস্থিতি এবং আদেশের ধারণার তীব্রতা। পুলিশের কোন স্বার্থে জনগণকে প্রয়োজন হয় না। জনগণ না তার উন্নতিতে ভূমিকা রাখে, না অবনতিতে। আইন পুলিশকে কেবলমাত্র আদেশ পালনের কথা-ই বলে। সেক্ষেত্রে দুর্বল সরকারের সবল পুলিশ হয়ে থাকা ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। সেবাধর্মী পুলিশ জবরদস্তিমূলক পুলিশের থেকে খোলনলচে আলাদা। জবরদস্তিমূলক পুলিশ আদতে রাজনৈতিক পুলিশ। জনগণের পুলিশ হয়ে উঠতে পুলিশের স্বার্থের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। সেটা কয়েকটি ধরনে হতে পারে। যেমন, পুলিশের সেবার মান যাচাইয়ে জনগণের অভিমত, জনগণের সাথে সংলাপ বিনিময়, পুলিশের কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততা, পুলিশকে বিসামরিকীকরণ এবং জনসম্পৃক্ত পুলিশের মডেল আত্মীকরণ। এর কোনটিই রাতারাতি ফল লাভের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।
তথ্যসূত্র
অহন, আল-আমিন হক, “দেশে মাদকাসক্ত অন্তত ১ কোটি, বেড়েছে নারী মাদকসেবীর সংখ্যা: পরিসংখ্যান”, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন (২০২৪), https://www.itvbd.com/national/155203.
আলম, শেখ সাবিহা, “নতুন মাদকের ছড়াছড়ি, কমেনি ইয়াবা; পরিস্থিতি জটিল”, প্রথম আলো (২০২২), https://www.prothomalo.com/bangladesh/qlwxg96lto
Arnold, David. “The armed police and colonial rule in South India, 1914—1947.” Modern Asian Studies11.1 (1977): 101-125.
Cox, Edmund C. Police and crime in India. (1911). Stanley Paul & Co.
Goffman, Alice. “On the run: Wanted men in a Philadelphia ghetto.”American sociological review 74.3 (2009): 339-357.
Kraska, P. B. “Militarization and policing–its relevance to 21st Century police.” Policing, vol. 1, no. 4, 7 Nov. 2007: 501–513, https://doi.org/10.1093/police/pam065.
Lutz, Catherine. “Militarization” in A Companion to the Anthropology of Politics (2007): 318-331.
Meares, Tracey L. “Norms, legitimacy and law enforcement.” Or. L. Rev. 79 (2000)
Mukhopadhyay, Surajit C. “Importing back colonial policing systems? The relationship between the Royal Irish Constabulary, Indian policing and militarization of policing in England and Wales.”Innovation: The European Journal of Social Science Research 11.3 (1998): 253-265.
Scarry, Elaine. “The body in pain: The making and unmaking of the world.” in The Body. Routledge, 2020: 324-326.
Sir Robert Peel’s Policing Principles. Law Enforcement Action Partnership (n.d.), https://lawenforcementactionpartnership.org/peel-policing-principles/
